ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার | ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ 

সর্বশেষ আপডেট: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ২১:১০
চলমান বার্তা:
গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন অর্ধেকে
শাহিদুল ইসলাম সায়ান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১৫:৪৭ আপডেট: ১০.০৪.২০২৬ ১৫:৩৪  (ভিজিটর : )

দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। শিল্প খাতের এই সংকট শুধু উৎপাদনেই প্রভাব ফেলছে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক এক গোলটেবিল বৈঠকে উঠে এসেছে, গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে- যা শিল্প খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংকেত।

রাজধানীর মতিঝিলে আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক আলোচনায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহে অনিয়মিততা এবং ঘাটতির কারণে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর ফলে অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।’

শুধু পোশাক শিল্প নয়, এই জ্বালানি সংকট এখন দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। সিমেন্ট শিল্পে উৎপাদন ব্যয় প্রতি ব্যাগে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে স্টিল ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে কাঁচামাল ও লজিস্টিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্টিল স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি ৭০ থেকে ৯০ ডলার পর্যন্ত এবং ওষুধ উৎপাদনের উপকরণের ব্যয় ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিবহন খাতেও জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে। কনটেইনার ফ্রেইট চার্জ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানিকারকদের প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ছে।

ঢাকা চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) জ্বালানি সংকটকে তাদের ব্যবসার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৯০ টাকায় পৌঁছানোয় ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

এই সংকট শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও এর গভীর প্রভাব পড়ছে। গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিত লোডশেডিং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। অন্যদিকে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষদের তাদের মোট আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ শুধু জ্বালানি খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

কৃষি খাতও এই সংকট থেকে বাদ যায়নি। ডিজেলের আমদানি মূল্য ১৭.৬৫ শতাংশ বেড়েছে এবং সার আমদানির ব্যয় প্রায় ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন ব্যবস্থার অভাবে উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ শতাংশ সংগ্রহের পরপরই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা মিলিয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে এটি এখন আর শুধু সাময়িক সমস্যা নয়, বরং একটি কাঠামোগত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা চেম্বার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেছে। তাদের মতে, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে মালয়েশিয়া বা ব্রুনাই থেকে জ্বালানি আমদানি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ৯০ থেকে ১৮০ দিনের ডিফার্ড পেমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

চেম্বার আরও বলেছে, পরিকল্পিত লোডশেডিং, কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানি রেশনিং এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, এনার্জি অডিটিং চালু করা এবং পুরোনো গ্যাস পাইপলাইন দ্রুত সংস্কার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা তৃতীয় এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) স্থাপন, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন।

এছাড়া বাজেটে জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলোর জন্য বিশেষ প্রণোদনা, শুল্ক হ্রাস এবং ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার মতো নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে, গ্যাস সংকট এখন দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

দেশবার্তা/আরএইচ
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
Loading...
Loading...
দেশবার্তা    বিজ্ঞাপন    সার্কুলেশন    শর্তাবলি ও নীতিমালা    গোপনীয়তা নীতি    যোগাযোগ   
স্বত্ব © ২০২৬ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।