ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে এর আগেই দলীয় প্রার্থী হিসেবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেছে এনসিপি। ফলে একই আসনে জোটের দুই দলের পৃথক অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বিষয়টিকে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে সমঝোতার অভাবের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। আবার অন্যদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়ায় প্রতিটি দলই আপাতত নিজেদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী করতেই মনোযোগ দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হবে কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি জোটবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছিল। তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপি এখন একক প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। ঢাকা দক্ষিণে তাদের মনোনীত প্রার্থী আসিফ মাহমুদ।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনী জোট বা আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি। এ অবস্থায় ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের পক্ষ থেকে সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার উদ্যোগে এনসিপির একটি অংশে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন আসিফ মাহমুদ। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সরকার থেকে পদত্যাগ করে এনসিপিতে যোগ দেন এবং বর্তমানে দলটির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন করেননি।
এনসিপির একাধিক নেতার দাবি, সংসদ নির্বাচনেও আসিফ মাহমুদকে সমর্থন দিতে জামায়াতের আপত্তি ছিল। তাদের ভাষ্য, উপদেষ্টা থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা কিছু অভিযোগকে কেন্দ্র করে জামায়াত সমর্থন দিতে অনাগ্রহী ছিল।
আবার এনসিপির আরেকটি সূত্রের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনের সময় জামায়াতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে আসিফ মাহমুদের অবস্থানের কারণেও দলটির আপত্তি রয়েছে। তবে ঠিক কোন বিষয়গুলো নিয়ে আপত্তি, সে বিষয়ে কেউ বিস্তারিত বলতে চাননি।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপির নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আসিফ মাহমুদ। যদিও এই বৈঠককে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য কোনো নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এনসিপির দায়িত্বশীল নেতাদের ভাষ্য, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোন সিটিতে কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তও আসতে পারে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, বর্তমানে প্রতিটি দল নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার কাজ করছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যদি বিরোধী প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে সমঝোতার প্রয়োজন হয়, তখন দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে।
অন্যদিকে গত বছরের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হওয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা মো. আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত, তাঁকে ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি সম্প্রতি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্বও ছেড়েছেন।
জামায়াত সাদিক কায়েমকে সামনে আনার পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এ অবস্থায় আসিফ মাহমুদ শেষ পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ থেকেই নির্বাচন করবেন, নাকি অন্য কোনো সিটিতে প্রার্থী হবেন। এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আসিফ মাহমুদ বলেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো ধরনের রাজনৈতিক বোঝাপড়া হবে বলে তিনি আশা করেন। সেটি রাজনৈতিক জোটের মাধ্যমে হোক বা নির্বাচনী সমঝোতার ভিত্তিতে- সব ধরনের সম্ভাবনাই খোলা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়টিতে জয় পাওয়া এনসিপি এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আরও বিস্তৃতভাবে অংশ নিতে চায়। আসিফ মাহমুদ বলেন, দলটি চায় দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রার্থী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। সমঝোতা হলেও অন্তত ৭০ শতাংশ স্থানে এনসিপির প্রার্থী রাখার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশবার্তা/একে