বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছে ইরান। তবে দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রাখে, তবে তারা আবারও এই জলপথটি বন্ধ করে দেবে।
স্থানীয় সময় শনিবার (১৮ এপ্রিল) ভোরে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে এই প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে না।
এর আগে, গতকাল (শুক্রবার) দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এখন বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত। লেবাননে ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘোষণা এল।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে এই খবরটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন এবং সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন যে, প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত এবং যাতায়াতের জন্য প্রস্তুত বলে ঘোষণা করেছে ইরান। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই আরেকটি পোস্টে তিনি জানান, যতক্ষণ পর্যন্ত তেহরানেরর সঙ্গে আমাদের লেনদেন বা চুক্তি শতভাগ সম্পন্ন না হচ্ছে, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
অপরদিকে, ইরানি নেতারা এই অবরোধকে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে প্রণালিটি পুনরায় বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
জানা গেছে, অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী একাধিক ইরানি জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
আগামী সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো চুক্তি না হলে তিনি কী করবেন—শুক্রবার রাতে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি জানি না... তবে সম্ভবত আমি এর মেয়াদ বাড়াব না। সেক্ষেত্রে অবরোধ বহাল থাকবে এবং দুর্ভাগ্যবশত আমাদের আবারও হামলা শুরু করতে হবে। তবে ওয়াশিংটনের পথে এয়ারফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকদের তিনি এটিও বলেন যে, একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা টোল (শুল্ক) আদায়ের বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
পারমাণবিক ইস্যুতে আগের আলোচনাগুলো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলেও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, খুব শিগগিরই তেহরানের সঙ্গে নতুন আলোচনা হতে পারে।
সম্ভাব্য আলোচনার এই আশাবাদ বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমিয়ে এনেছে, কারণ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করতে পারে বলে উদ্বেগ ছিল।
তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দেশটির কিছু আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম প্রণালি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের স্পষ্টতা এবং কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তের জন্য এখনও শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।
কেপলার নামক একটি ডেটা ফার্ম জানিয়েছে, প্রণালির ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও এমন কিছু করিডোরের মধ্যে সীমাবদ্ধ যা ব্যবহারের জন্য ইরানের অনুমতির প্রয়োজন হয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক্সে জানিয়েছে, গত সোমবার অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী এখন পর্যন্ত ২১টি জাহাজকে ইরানে ফেরত পাঠিয়েছে।
এদিকে, লেবাননে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে বলে মনে হচ্ছে, যা সামগ্রিক উত্তেজনা প্রশমন এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে। তবুও, সব পক্ষ এই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে চলবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে এখনও ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতির কারণে।
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরুর পরপরই একটি ইসরায়েলি হামলায় বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে। কোনো পক্ষই এখনও চুক্তির শর্তাবলি পুরোপুরি অনুসরণের নিশ্চয়তা দেয়নি।
বর্তমানে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে প্রধান অমীমাংসিত বিষয়গুলো হলো— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ক্ষতিপূরণ।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়ে নতি স্বীকার করতে পারে। তবে ইরান বা মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে এর কোনো সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।