টানা কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ। আয়ের তুলনায় ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ে বসবাসকারী শাহনাজ আক্তারের ছয় সদস্যের পরিবারটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেও যে বাজার ৪০০ টাকায় হতো, এখন তা ৬০০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবজি কিনলে তেল কেনার টাকা থাকছে না। শাহনাজ জানান, তেল ছাড়া রান্না সম্ভব নয়, কিন্তু হাতে টাকাও নেই। তার স্বামী পেশায় অটোরিকশাচালক। সংসার চালাতে এখন হয় স্থানীয় দোকান থেকে বাকি নিতে হচ্ছে, না হয় খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে।
শাহনাজের এই সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, টানা ৫০ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি। গত মার্চ মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে মানুষের ‘প্রকৃত আয়’ এখন ঋণাত্মক। অর্থাৎ কাগজে-কলমে বেতন বাড়লেও বাজারের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষ আগের চেয়ে কম পণ্য কিনতে পারছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, শ্রমিকেরা এখন উভয় সংকটে আছেন; একদিকে পণ্যের দাম বাড়ছে হু হু করে, অন্যদিকে মজুরি বাড়ছে খুব ধীরগতিতে।
গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ২০ শতাংশ বাড়ানোর সরকারি ঘোষণা সাধারণ মানুষের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর রেশ ধরে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এলপিজি গ্যাসের দামও।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রেজানুর রহমান রিফাত জানান, জ্বালানি খরচ বাড়লে মুহূর্তেই সবকিছুর দাম বেড়ে যায়, কিন্তু আগামী বছরের আগে তার বেতন বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে সঞ্চয় কমিয়ে বা পারিবারিক খরচ কাটছাঁট করেই তাকে টিকে থাকতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। যারা আগে থেকেই কষ্টে ছিল, তাদের জন্য আর নতুন করে ছাড় দেওয়ার কোনো জায়গা নেই।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব এরই মধ্যে রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজারে দৃশ্যমান হয়েছে।
সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য ও বাজার দর অনুযায়ী, এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ ছাড়া আদা, রসুন, আটা এবং ডালের দামও কয়েক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে কাঁচামরিচের বাজারে, যার দাম একলাফে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে প্রতিটি সবজির দামই এখন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
আর্থিক এই চাপে মানুষ এখন খাবারের গুণগত মানের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, যারা আগে সোনালি মুরগি কিনতেন, তারা এখন ব্রয়লার কিনছেন। এমনকি যারা পাঙাশ মাছ এড়িয়ে চলতেন, তারা এখন নিরুপায় হয়ে কম দামি এই মাছই কিনছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান জানান, মানুষ এখন সস্তা ও নিম্নমানের খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের মেধা ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে, যার আর্থিক ক্ষতি পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বাংলাদেশে আরও ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে এমন শঙ্কা নিয়েই দিন পার করছেন শাহনাজ আক্তারের মতো অসংখ্য কর্মজীবী মানুষ।
দেশবার্তা/একে