ই-পেপার |  ঢাকা, বাংলাদেশ  |  রোববার | ১৭ মে ২০২৬ | ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ 
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793693_Self-1.jpg
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793710_Self-2.jpg

সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ২০:৪৩
চলমান বার্তা:
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে কী হচ্ছে?
দেশবার্তা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১৫:০৪ আপডেট: ১৬.০৫.২০২৬ ১৯:২৮  (ভিজিটর : )

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ নবায়ন হবে নাকি দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে- সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ে প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এই প্রস্তুতির মধ্যেই ভারতের দিক থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে নতুন ফর্মুলার কথা বলা হচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভারতের পক্ষ থেকে যেসব প্রস্তাবের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা বিদ্যমান চুক্তির ভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অযৌক্তিক। এতে চুক্তি নবায়ন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তির বিষয়ে কোনো প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে।

তিনি বলেন, আমরা আশা করছি দুই দেশের বিশেষজ্ঞ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসবে। এরপর মন্ত্রীপর্যায়ে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করছি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের কারিগরি দল এ বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু করেছে। যৌথ নদী কমিশনের অধীনে বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর দুই দেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসতে পারে।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ফারাক্কা বাঁধ চালুর প্রায় দুই দশক পর সম্পাদিত ওই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, গঙ্গা নদীতে পানির প্রবাহের পরিমাণের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগি হয়। চুক্তিতে বলা হয়েছে, পানির প্রবাহ যদি ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হয়, তাহলে বাংলাদেশ ও ভারত সমান সমান পানি পাবে। যদি পানির প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি পাবে ভারত। আর পানির প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত হবে।

তবে এখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। জানা গেছে, ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহকে ভিত্তি ধরে নতুন কাঠামো তৈরি করতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ চাইছে পুরো গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে পানি বণ্টনের বিষয়টি নির্ধারণ করতে।

বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা পয়েন্টকে ভিত্তি করে পানি ভাগাভাগির প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। কারণ উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে ফারাক্কা এলাকায় পানির প্রবাহ অনেক কমে গেছে। সেই কম প্রবাহকে ভিত্তি ধরে নতুন হিসাব করলে বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফর করে। ওই সফরের সময় গত ৪ মে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পানিসহ সব দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে আলোচনা করতে ভারত প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান, গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে যৌথ নদী কমিশন সময়মতো কাজ করবে।

ওই প্রতিনিধি দলে থাকা নিউ এজ পত্রিকার সাংবাদিক মুস্তাফিজুর রহমান জানান, বিক্রম মিশ্রি বলেছেন যে বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে পানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারত আলোচনা করতে প্রস্তুত।

একই সফরে ৫ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে আরেকটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তির সময় যে ফর্মুলা ব্যবহার করা হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা আর কার্যকর নাও হতে পারে।

তিনি বলেন, ওই সময় ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পানিপ্রবাহের তথ্যকে ভিত্তি ধরা হয়েছিল। এখন নতুন বাস্তবতায় সাম্প্রতিক ৪০ বছরের পানিপ্রবাহকে বিবেচনায় আনা উচিত।

তবে যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ও নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত এ ধরনের চিন্তাকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, গঙ্গা নদী তো ফারাক্কা থেকে শুরু হয়নি। উজানে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করার কারণে সেখানে পানির প্রবাহ কমে গেছে। ফলে ওই কম প্রবাহের গড় ধরে পানি ভাগাভাগি ন্যায্য হবে না।

তিনি আরও বলেন, দুই দেশ আগেই সম্মত হয়েছিল যে গঙ্গার পানিবণ্টন নদীর মোট প্রবাহের ভিত্তিতে হবে। এখন সেই অবস্থান থেকে সরে আসা ঠিক হবে না।

আইনুন নিশাতের মতে, বাংলাদেশ ও ভারত বর্তমানে সুসম্পর্কের কথা বলছে এবং এই সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো পানি। তাই আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ফারাক্কা বাঁধ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের মনোহরপুর এলাকায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে এর উদ্বোধন করা হয়।

ভারতের দাবি ছিল, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করতে গঙ্গার অতিরিক্ত পানি ভাগীরথী নদীতে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এজন্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কৃত্রিম খালও খনন করা হয়।

তবে বাংলাদেশের অভিযোগ, ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে গেছে। এর ফলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

ফারাক্কা ইস্যুতে ১৯৭৬ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘ফারাক্কা লং মার্চ’ কর্মসূচি পালন করেছিলেন, যা সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ফারাক্কা বাঁধ পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার মধ্যে অবস্থিত। বাঁধটি চালুর দুই দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে প্রতি ১০ দিন পরপর পানির স্তর পরিমাপ করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টনের কথা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ প্রতি ১০ দিনে ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা।

গত কয়েক বছর ধরেই চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে গঙ্গার পানি চুক্তি পুনর্নবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা বৈঠক করেন। ওই সময় দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা এলাকায় সরেজমিনে পানিপ্রবাহের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জরিপ পরিচালনা করেন।

পরে কলকাতায় যৌথ নদী কমিশনের অধীনে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমিটির ৮৬তম বৈঠকে ওই জরিপের তথ্য ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়।

তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় চুক্তি নবায়নের বিষয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।

ফেব্রুয়ারিতে ভারতের লোকসভায় এক প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন জানান, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিরা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।

এদিকে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলের শুরুতে দিল্লি সফরে যাওয়ার আগে জানিয়েছিলেন, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি তার সফরের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।

দিল্লি সফরকালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়া উচিত। এটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান চুক্তির মেয়াদ কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হবে। আমরা এমন একটি সংশোধিত চুক্তি চাই, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন পূরণে সক্ষম হবে।

তবে দিল্লি সফরে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না কিংবা নতুন চুক্তির কাঠামো কী হতে যাচ্ছে- সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সূত্র: বিবিসি বাংলা

দেশবার্তা/একে
মতামত লিখুন:
আরও পড়ুন 
নির্বাচিত সংবাদ
কৃষককে পাশে বসিয়ে সুখ-দুঃখের কথা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী
কৃষককে পাশে বসিয়ে সুখ-দুঃখের কথা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী
কারিনার মরদেহ দেশে আসার বিষয়ে যা জানা গেল
কারিনার মরদেহ দেশে আসার বিষয়ে যা জানা গেল
উচ্চ মূল্যস্ফীতি-বিনিয়োগ স্থবিরতায় চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে
উচ্চ মূল্যস্ফীতি-বিনিয়োগ স্থবিরতায় চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে
স্বত্ব © ২০২৫ দেশ বার্তা | সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793725_Self-3.jpg
https://thedailydeshbarta.com/ad/1756793740_Self-4.jpg