মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের স্মৃতি বিজড়িত পার্কের নাম পরিবর্তন এবং সেটি গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার রাজউক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন দেশের ২৩ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
মঙ্গলবার (১৯ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে নাগরিকেরা এই সিদ্ধান্তকে ‘চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রচলিত আইন ও নাগরিক অধিকার সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ২০২০ সালে গুলশানের এই পার্কটির যে নামকরণ করেছিল ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক’, তা পরিবর্তন করে ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ নাম দিয়েছে। রাজউক কোনো বৈধ এখতিয়ার ছাড়াই এই কাজ করেছে। সর্বজনশ্রদ্ধেয় মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রীর নাম এভাবে পরিবর্তন করে তাঁকে অসম্মান করার কোনো অধিকার রাজউক বা অন্য কোনো সরকারি এজেন্সির নেই।
নাগরিকেরা আরও উল্লেখ করেন, এর আগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে রাজউক এই মাঠ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশনা দিলে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব একটি রিট পিটিশন (নম্বর: ২৮৯১/২০১৩) দায়ের করে। উচ্চতর আদালত সেই রিট খারিজ করে মাঠের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশনা প্রদান করেন। বর্তমানে সেই একই দখলদারদের অবৈধ স্থাপনাকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ন্যাক্কারজনক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পার্কটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং পুনরায় রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদেরই দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে জানানো হয়, গুলশান ইয়ুথ ক্লাব মূলত অলাভজনক সামাজিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও ২০১৩ সালে তারা ওই পার্কে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে কিছু স্থাপনা নির্মাণ করেছিল। অনেক আগে থেকেই গুলশান পার্কের ৫ দশমিক ৫৪ একর জমি তারা দখল করে রেখেছিল বলে অভিযোগ আছে। এই পার্ক ও মাঠটি ব্যবস্থাপনার নামে তারা ভাড়া দিয়ে অর্থ রোজগারের পথ উন্মুক্ত করবে বলে অভিযোগ উঠেছে, যাতে শুধু ধনী লোকের সন্তানরা টাকা দিয়ে খেলতে পারে, যা মাঠ, পার্ক ও জলাধার আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে পার্কটির পূর্বতন নাম ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক’ ফিরিয়ে আনার এবং পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানান।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী নাগরিকেরা হলেন- মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নিজেরা করি-র সমন্বয়কারী খুশী কবির, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও ব্লাস্টের অনরারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী।
বিবৃতিতে আরও স্বাক্ষর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন, লেখক রেহেনুমা আহমেদ, বিএনডব্লিউএলএর নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী, মানবাধিকার কর্মী মো. নুর খান, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ, কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, মানবাধিকার কর্মী সাঈদ আহমেদ এবং কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক হানা শামস আহমেদ।
দেশবার্তা/একে