দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর ফলে গত মার্চ শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা ছিল ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। মার্চ ২০২৬ শেষে তা ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে ঠেকেছে।
অন্যদিকে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের হিসাব ধরলে তিন মাসে তা ১৯ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। মার্চ ২০২৬ শেষে এই ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের গ্রস হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ হয়েছে।
খেলাপি ঋণের বার্ষিক বা এক বছরের ব্যবধানের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। গত মার্চ ২০২৫ ত্রৈমাসিকে ব্যাংকিং খাতে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের গ্রস হার ছিল মাত্র ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশের ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের গ্রস হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতের মোট রক্ষিতব্য প্রভিশন ছিল ৪ লাখ ৬১ ৭১৪ কোটি টাকা, যার বিপরীতে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করতে পেরেছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধিতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মার্চ ২০২৫ শেষে ব্যাংকিং খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা, যা মার্চ ২০২৬ এ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিগত এক বছরে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে (৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ) এবং সবচেয়ে কম বেড়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে (০ দশমিক ৯২ শতাংশ)।
দেশবার্তা/একে