স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (ইউএনসিডিপি)। ফলে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইউএনসিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পো বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন, উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাবের সঙ্গে কমিটি একমত। এর ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে এ বিষয়ে ইতিবাচক সুপারিশ পাঠানোর পথ সুগম হয়েছে।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের নভেম্বর। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব বিবেচনায় সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর আবেদন জানায়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৬ এপ্রিল জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।
ইউএনসিডিপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মানদণ্ড উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে অতিক্রম করেছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আয়সংক্রান্ত সূচকে দেশের অবস্থান শক্তিশালী। নিকট ও মধ্যমেয়াদে এসব সূচকে বড় ধরনের অবনমনের ঝুঁকিও কম।
তবে কমিটি মনে করছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের উত্তরণ প্রস্তুতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় অতিরিক্ত সময় পাওয়া বাংলাদেশের জন্য উপকারী হবে।
ইউএনসিডিপি বলেছে, প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অর্থ সংস্কার কার্যক্রম বিলম্বিত করা নয়। বরং এই সময়কে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জনের জন্য কাজে লাগাতে হবে।
কমিটি বাংলাদেশের প্রণীত ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (এসটিএস) বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব আরও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা, প্রয়োজনীয় নীতিগত সমন্বয় করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে ইউএনসিডিপি। সহজ শর্তে অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা, বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য বিদ্যমান সুবিধাগুলোর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যায়নে বিশেষভাবে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কর আহরণ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ জোরদার করা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশবার্তা/এসআইএস/একে