কিছু মানুষের প্রস্থান কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; তা একটি বৌদ্ধিক যুগের পরিসমাপ্তির ঘণ্টাধ্বনি। তাঁদের মৃত্যু ব্যক্তিগত শোকের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতির মননজগতে দীর্ঘ ছায়া ফেলে। বাংলা একাডেমির সভাপতি, প্রখ্যাত লেখক, গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণ (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) তেমনই এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি যেন বাংলা ভাষা ও চিন্তার আকাশে জ্বলতে থাকা এক ধ্রুবতারা; তাঁর দেহাবসান ঘটেছে, কিন্তু তাঁর আলোকরেখা এখনও আমাদের বৌদ্ধিক আকাশে দীপ্ত।
রোববার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ৮৫ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর এই আকস্মিক সংবাদ যেন হঠাৎ করেই বইয়ের তাক থেকে একটি অপরিহার্য গ্রন্থ হারিয়ে যাওয়ার মতো, কিংবা শতবর্ষী বটবৃক্ষের নীরব পতনের মতো-যার অভিঘাত অনেক দূর পর্যন্ত অনুভূত হয়। একজন মানুষের মৃত্যুতে একটি পরিবার শোকাহত হয়; কিন্তু একজন মনীষীর মৃত্যুতে শোকাহত হয় একটি জাতির জ্ঞানভাণ্ডার।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন সেই বিরল বুদ্ধিজীবীদের একজন, যাঁরা শব্দকে অলংকারের জন্য নয়, সত্যের অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহার করতেন। তাঁর লেখনী ছিল যুক্তির দীপ্তি, মানবিকতার উষ্ণতা এবং ইতিহাসসচেতন দৃষ্টিভঙ্গির এক অনন্য সমন্বয়। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজচিন্তা ও জাতীয় ইতিহাস নিয়ে তাঁর নিরলস গবেষণা আমাদের বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের মুক্তি, ন্যায়বোধ ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে কথা বলে।
শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি ছিলেন চিন্তার দুয়ার খুলে দেওয়া এক আলোকস্রষ্টা। তাঁর শ্রেণিকক্ষে মুখস্থ বিদ্যার স্থান ছিল না; সেখানে জন্ম নিত প্রশ্ন, বিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং নতুন চিন্তার সাহস। তিনি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন-সত্যকে জানতে হলে প্রচলিত বিশ্বাসেরও সমালোচনা করতে হয়, আর জ্ঞানচর্চা মানে কেবল তথ্য আহরণ নয়, নিজেকে প্রতিনিয়ত নবায়ন করা। তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতির নানা অঙ্গনে কাজ করছেন-তাঁদের মধ্যেই তাঁর চিন্তার বীজ অঙ্কুরিত হয়ে চলেছে।
বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ ছিল কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়; এটি ছিল জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির প্রতি রাষ্ট্রের এক ধরনের স্বীকৃতি। তিনি চেয়েছিলেন, বাংলা একাডেমি আরও বেশি গবেষণামুখী, চিন্তানির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। তাঁর সেই স্বপ্ন আজ অসমাপ্ত থেকে গেল, কিন্তু স্বপ্নের শক্তি কখনো মানুষের জীবনাবসানের সঙ্গে শেষ হয় না।
আমাদের সময়ের একটি বড় সংকট হলো, শব্দের কোলাহল বেড়েছে, কিন্তু গভীর চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মনীষীরা ছিলেন নির্মল বাতিঘরের মতো-যাঁরা ঝড়ের মধ্যেও পথ চিনিয়ে দেন। তিনি জনপ্রিয়তার সহজ শর্টকাট বেছে নেননি; বরং সত্য, যুক্তি ও বিবেকের কঠিন পথেই অবিচল থেকেছেন। সেই কারণেই তাঁর জীবন আমাদের কাছে কেবল স্মৃতির বিষয় নয়, অনুকরণেরও বিষয়।
একজন লেখকের প্রকৃত মৃত্যু ঘটে তখনই, যখন তাঁর চিন্তা বিস্মৃত হয়। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ক্ষেত্রে সেই আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। তাঁর রচনা, গবেষণা, ভাষ্য এবং বৌদ্ধিক সততা আগামী প্রজন্মের পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন-ভাষাকে ভালোবাসা মানে কেবল ভাষার সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়; ভাষার মাধ্যমে মানুষ, সমাজ ও সভ্যতার গভীরতম সত্যকে আবিষ্কার করা।
আজ তাঁর বিদায়ে বাংলা ভাষা যেন তার এক নিবেদিত প্রহরীকে হারাল, শিক্ষা হারাল এক আলোকিত শিক্ষককে, গবেষণা হারাল এক নিরলস অনুসন্ধানীকে এবং জাতি হারাল এক বিবেকবান চিন্তাশ্রমিককে। তবু এই বিদায় চূড়ান্ত নয়। কারণ সত্যিকারের মনীষীরা তাঁদের পদচিহ্ন সময়ের বালুকাবেলায় নয়, মানুষের চেতনার গভীরে রেখে যান। সেখানে মৃত্যুর কোনো অধিকার নেই।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন। তাঁর প্রজ্ঞা, সততা ও জ্ঞানসাধনার উত্তরাধিকার আমাদের জাতীয় জীবনকে আরও আলোকিত করুক—এটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: মো. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজকর্মী (লেখাটি লেখকের নিজস্ব)