বাংলাদেশ রেলওয়ে আধুনিকীকরণ ও যাত্রীসেবা উন্নত করার লক্ষ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি থেকে ২০১৮ সালে ৩০টি লোকোমোটিভ ইঞ্জিন আমদানি করা হয়। প্রতিটি ইঞ্জিনের দাম ছিল ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা। উন্নত প্রযুক্তি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী হিসেবে প্রচারিত এসব ইঞ্জিন বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নতুন গতি আনবে বলে আশা করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলেক্ট্রো-মোটিভ ডিজেলের (ইএমডি) লাইসেন্স নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম ৩০টি ইএমডি জিটি৩৮এসিএল মডেলের এসব লোকো বাংলাদেশের জন্য উৎপাদন করে, যা ২০২০ সালে দেশে আসে। এদেরকে ৩০০০ সিরিজ দেওয়া হয়। নতুন লোকোগুলোকে যাত্রীবাহী ও মালবাহী উভয় ধরনের ট্রেনেই ব্যবহার করা হয়। ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর ঢাকা-চট্টগ্রাম কন্টেইনার ট্রেনে ৩০০১ লোকো ব্যবহারের মাধ্যমে এদের প্রথম বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়।
কিন্তু ক্রয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় ১১টি ইঞ্জিন বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে গেছে। ইঞ্জিনের মূল যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো ওয়ার্কশপে পড়ে আছে। এর ফলে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় বাড়ছে, আর প্রতিদিন শত শত যাত্রীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
প্রকৌশল বিভাগ বলছে, ত্রুটিগ্রস্ত ইঞ্জিন মেরামতে যেসব যন্ত্রাংশ প্রয়োজন, তা বিদেশ থেকে আনতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং ব্যয়ও অনেক বেশি। তাছাড়া গ্যারান্টি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় হুন্দাই থেকে বিনা খরচে যন্ত্রাংশ পাওয়ার সুযোগও নেই।
এসব ইঞ্জিনের লাইফ টাইম ২০ বছর ধরা হলেও ২ বছরেই একাধিক ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেছে। স্পেয়ার পার্টস দুষ্প্রাপ্যতা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা কারণে ৮টি ইঞ্জিন সচল হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। বাকী ৩টি কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা যেতে পারে বলে জানান প্রকৌশলীরা।
বেশ কয়েকটি ইঞ্জিনের ৪টি মোটরের মধ্যে ২টি করে মোটর নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে ২টি মোটর নিয়ে ফুল স্পীড নিয়ে চলতে পারছেনা অনেকগুলো ইঞ্জিন। কোথাও লাইন একটু উচু হলে রাস্তায় থেমে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। ব্রীজ অতিক্রম করতে বেগ পেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানার (কেলোকা) প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলাম বলেন, যন্ত্রাংশ সংকটে ৩০১৫ ও ৩০২৮ লোকোমোটিভ অচল আছে। স্পেয়ার পার্টসের জন্য চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে। যন্ত্রাংশ না পেলে এগুলো চালু করা যাবেনা। আর ৩০০৯ ইঞ্জিনটি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সচল করা যাবে। তবে যন্ত্রাংশ সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ৮৫ শতাংশ যন্ত্রাংশের স্টক শুন্য। সরবরাহ প্রক্রিয়া আরো গতিশীল না হলে রেল চালানোই মুশকিল হয়ে পড়বে।
ইঞ্জিনের সংকট স্বীকার করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী (সিএমই) কাজী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, রেলের প্রায় ৩০ হাজার আইটেমের পার্টস আছে। এরমধ্যে অনেক আইটেমের স্টক শুন্য। যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে কাজ করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন ১১৬ টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৭৫ থেকে ৮০টি। গড়ে প্রতিদিন ৪০ টির মতো ইঞ্জিন সংকট থাকে।
পাহাড়তলীস্থ ডিজেলশপের কর্মব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এতেসাম মো. শফিক বলেন, কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে ৩০টি ইঞ্জিন আমদানিতে কর্তৃপক্ষের ভুল ছিল। যেহেতেু এই টেকনোলজিটা নতুন, তাই এগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার মতো অভিজ্ঞতা আমাদের টেকনিশিয়ানদের নেই। তাদের উচিৎ ছিল আগে টেকনিশিয়ানদের পর্যাপ্ত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা। কিন্তু তারা তা না করে অফিসারদের নিয়ে বিদেশ সফর করেছে, যা পরিচালনায় কোন কাজে আসেনি। একেকটা ইঞ্জিনের জন্য ৬টি ডিপার্টমেন্ট কাজ করে আর এই ৬টি ডিপার্টমেন্টে থেকে কমপক্ষে একজন করে টেকনিশিয়ান বা প্রকৌশলীকে ট্রেনিং করানো উচিত ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। ফলে পরিচালনা বা মেরামতের কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকের সংকট।
তিনি আরও বলেন,৩ বছরের ওয়ারেন্টি মেয়াদ পর্যন্ত সার্ভিস দিয়েছে। কিছু বিষয় সমাধান করেনি। আমরা তাদের জানাতে লেট হয়েছে বলে জানান সরবরাহকারী। বিদেশি শিপমেন্ট জটিলতার অজুহাতে তারা প্রস্তাবনা পাঠাতে বিলম্ব করেছে। সম্ভবত প্র্রস্তাব পৌছাতে পৌছাতে ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। আর এসব ইঞ্জিনের পার্টসগুলো তাদের কাছে ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায়না। রেল এখন নতুন করে তাদের সাথে সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করার চেষ্টা করছি।
যন্ত্রাংশ সংকটের ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) মো. বেলাল সরকার বলেন, যন্ত্রাংশের প্রচুর চাহিদাপত্র জমা পড়েছে। কেনাকাটার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নেই। গত অর্থবছরে বরাদ্দ কম পেয়েছি, এবারও ৪০০ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে ২১০ কোটি বরাদ্দ দিয়েছে, এটা যথেষ্ট নয়। বকেয়া আছে ১৬০ কোটি টাকা। তবু বিদেশি মালের জন্য এলসি করা হয়েছে, অক্টোবরের মধ্যে কিছু যন্ত্রাংশ এসে পৌছাবে বলে আশা করছি।
ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের এই সংকট কাটানোর উদ্যোগ নিচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যন্ত্রাংশ ক্রয় খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। ইঞ্জিন আমদানির জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইনউদ্দিনকে। সদস্য সচিব রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক)।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রেলের মহাপরিচালক (ডিজি), ডিএমটিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের একজন অধ্যাপক। তবে এবারও হুন্দাই থেকে ইঞ্জিন কেনা হবে কি না, এই শংকায় ভুগছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট মহল ও শুভানুধ্যায়ীরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন শনিবার দৈনিক দেশবার্তাকে বলেন, এডিবি’র অর্থায়নে আমরা নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ ক্রয় করবো। টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে।
ডিজি জানান, এডিবির সাথে কাজ করতে গেলে টেন্ডার ডকুমেন্টসে তাদের অনুমোদন নিতে হয়। আমরা টেন্ডার ডকুমেন্টসের খসড়া তৈরি করেছি। খসড়া জমা দেওয়ার পর তারা কিছু পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ দিয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ এগোচ্ছি।
আগের বার হুন্দাই থেকে আনা লোকোমোটিভ সম্পর্কে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, হুন্দাইর লোকোমোটিভে ত্রুটি পাওয়ার পর আমরা ঠিকাদারকে অনুরোধ করেছিলাম সেগুলো সারিয়ে দেওয়ার জন্য। কোরিয়ান দূতাবাসের কাছেও আমরা সহায়তা চেয়েছি। কিন্তু তারা ওয়ারেন্টি পিরিয়ড পার হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে হাত গুটিয়ে নিয়েছে।
সেক্ষেত্রে এবারও হুন্দাইকে সুযোগ দেয়া হবে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, এটি হবে আন্তর্জাতিক ক্রয়ের ওপেন টেন্ডার। পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান লোকোমোটিভ তৈরি করে। তারা সবাই অংশগ্রহণ করতে পারবে। কোরিয়ার হুন্দাইকে আমরা এখনো কালো তালিকাভূক্ত করিনি, তাই তারাও উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। তবে তাদের ব্যাপারে আমরা সতর্ক থাকবো, বলা চলে, ওদের ব্যাপারে আমাদের একটা রিজার্ভেশনও থাকবে।
নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহের বাজেট কত, এ প্রশ্নের জবাবে রেলওয়ের ডিজি বলেন, অর্থের পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে গড়ে একটি লোকোমোটিভের দাম ৪০ কোটি টাকা, কিছু বেশিও হতে পারে। সে হিসেবে রাফলি বলা যায়, এটি ১২০০ কোটি টাকার প্রকল্প।