রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত সংখ্যক সচল ইঞ্জিন না থাকায় ট্রেন পরিচালনায় চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং বাড়ছে যাত্রী ভোগান্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে নতুন লোকোমোটিভ সংযোজন না হওয়া, পুরোনো ইঞ্জিনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক সময় একটি ইঞ্জিন দিয়েই একাধিক ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।
যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যেখানে প্রতিদিন প্রয়োজন ১১৯টি ইঞ্জিন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৭০ থেকে ৭২টি। পণ্য পরিবহনে যেখানে প্রতিদিন ১৫টি ইঞ্জিন প্রয়োজন, সেখানে মিলছে পাঁচটি।
এই সংকটের কারণে একদিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশ্রামের সুযোগ না পেয়ে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ইঞ্জিনগুলো, অন্যদিকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে বিপর্যয়। ইঞ্জিন সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সময়সূচিতে। প্রতিদিনই একাধিক ট্রেন এক থেকে দেড় ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীরা বিক্ষোভ করছেন।
এদিকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে ইঞ্জিন সংকটের মাঝেই আরও ১০টি স্পেশাল ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে এই সংকট আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্র জানায়, ইঞ্জিনের অভাবে একাধিক ট্রেন দেরিতে ছাড়ছে। ইঞ্জিন সংকটে গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটসহ একাধিক লাইনে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি ইঞ্জিন ট্রিপ শেষ করার পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছয় ঘণ্টা পূর্ণ শাটডাউন রেখে পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও তা মানা যাচ্ছে না। ফলে যেসব ইঞ্জিন আছে, সেগুলোর আয়ুষ্কাল দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
রেলের ইঞ্জিন সংকট শুধু ট্রেন চলাচলের সমস্যা নয়। পুরোনো ইঞ্জিন বিকল এবং নতুন ইঞ্জিন না থাকায় যাত্রী ও মালবাহী পরিবহন থেমে যাচ্ছে। এতে রেলের আয় কমছে, ট্রেন বন্ধ হচ্ছে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, পূর্বাঞ্চল রেলে চাহিদা অনুযায়ী ইঞ্জিন নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোকে যতটুকু সময় বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন, তা দেওয়া যাচ্ছে না। ইঞ্জিন সংকটের কারণে নতুন করে ট্রেন বাড়ানো যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ে ইঞ্জিনের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। ইঞ্জিন কেনার বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলের ওপর নির্ভর করছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকটের ফলে পুরোনোগুলো যথাসময়ে মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ঈদকে সামনে রেখে পুরোনো ইঞ্জিন মেরামতের কাজ চলছে। আশা করছি, ঈদের চাপ সামাল দিতে সক্ষম হব।
কেনাকাটার বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) মো. বেলাল সরকার বলেন, যন্ত্রাংশের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আমরা ইজিপি সিস্টেম মেনে দরপত্র আহ্বান করতে গিয়ে অনেক সময় নষ্ট করেছি। ফলে যথাসময়ে সরবরাহ সম্ভব হয়নি। তবে বিদেশি মালামাল আসা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও লোকোমোটিভ ইন্সপেক্টর এড. এম আর মনজু বলেন, পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন সংকট চরমে পৌঁছেছে। দ্রুত সমাধান করতে না পারলে রেলসেবা সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হয়ে যেতে পারে।
এই সংকটের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রেলের বড় বড় চেয়ারে কতিপয় দুষ্ট অফিসার বসে আছেন। তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে রেলের আজকের এই নাজুক অবস্থা।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি সময়মতো ইঞ্জিন সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিত, তাহলে ইঞ্জিন সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সরকার চাইলে ছয় মাসের মধ্যেই ইঞ্জিন আমদানি করতে পারে।
প্রতিনিধি/এসবি/একে