টাঙ্গাইলের মধুপুরে রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ ও আনসার সদস্যদের হাতে গারো আদিবাসী নারী ও শিশুদের ওপর হামলা, বসতভিটা ভাঙচুর এবং উচ্ছেদ চেষ্টার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস’-এর একটি প্রতিনিধি দল।
সোমবার দুপুরে উপজেলার কুরাগাছা ইউনিয়নের পূর্ব ধরাতি গ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
প্রতিনিধি দলটি গত ৯ মার্চ (সোমবার) ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক ঘটনার শিকার আদিবাসী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
পরিদর্শনকালে জানা যায়, ৬০ বছর বয়সী রমেন কুবি দীর্ঘ আট বছর ধরে তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ৫ শতাংশ জমিতে বসবাস করছেন। সম্প্রতি সেখানে ঘরের কাজ শুরু করলে বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের আওতাধীন চাঁদপুর রাবার বাগানের মাঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে আনসার সদস্যরা তাতে বাধা দেন। তারা ঘরের খুঁটি ভেঙে ফেলেন এবং রোপণ করা আম ও কাঁঠাল গাছ উপড়ে ফেলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাধা দেওয়ার একপর্যায়ে আনসার সদস্যরা ওই পরিবারের এক নারী সদস্যের দিকে রাইফেল তাক করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন।
পরিদর্শন শেষে এক মতবিনিময় সভায় সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা আপনাদের সংকটে পাশে দাঁড়াতে এসেছি। আপনারা যেন এখানে স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারেন, সেই লড়াইয়ে আমরা আছি। স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত সাড়া দিয়েছে, এটি ইতিবাচক। তবে ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে প্রশাসনের এমন দ্রুত ও ইতিবাচক পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তবে কোনো নাগরিক যেন এভাবে আক্রান্ত না হয়। আমরা দেখলাম এই পরিবারটি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, তাদের স্যানিটেশন ও শিক্ষার সুযোগ নেই। প্রশাসনের উচিত এসব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।
লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ আদিবাসীদের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, আদিবাসীদের বন ও ভূমি রক্ষার লড়াই দীর্ঘদিনের। গারো, কোচ, বর্মনসহ সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ঐক্যই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ঘটনার পরদিন ১০ মার্চ মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মির্জা জুবায়ের হোসেন ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ইউএনও ওই পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য দুই বান্ডিল ঢেউটিন, নগদ ৬ হাজার টাকা এবং অন্যান্য খরচ বহনের আশ্বাস দেন, যা ইতিমধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে না জানিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান না চালাতে বন বিভাগ ও রাবার বাগান কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি ম্যাথিউ চিরান, ব্লাস্ট-এর টাঙ্গাইলের স্টাফ ল্ ইয়ার শামসিন্নাহার লিজা এবং সতেজ চাকমা।
স্থানীয়দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- ইউপি সদস্য অর্চনা নকরেক, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের মর্নিংটন চিরান ও চন্দন চিরানসহ আরও অনেকে।
দেশবার্তা/একে