কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গত তিন দিনের টানা বৃষ্টি, তুফান ও বজ্রপাতে তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান। মাঠভরা সোনালি ধান এখন পানির নিচে। একদিকে চোখের সামনে ফসল নষ্ট হওয়া, অন্যদিকে বজ্রপাতের ভয়ে মাঠে নামতে না পারা- এই দুই সংকটে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষককে ক্ষেতের আইলে বসে কাঁদতে দেখা গেছে।
গত রোববার বিকেল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চলা এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলা।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকাসহ বিভিন্ন হাওরের প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে এখনো ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত কোনো হিসাব নেই।
সরেজমিনে হাওর ঘুরে দেখা গেছে, অনেক কৃষক নিরুপায় হয়ে ‘গলাডোবা’ পানিতে নেমে ধান কাটছেন। নৌকা বা কলাগাছের ভেলায় করে সেই ভেজা ধান পাড়ে আনা হচ্ছে। শ্রমিকের বাড়তি মজুরি দিয়েও অনেকে শেষ সম্বলটুকু রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেতেই ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরায় সেই ধান ঘরে তোলা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর হাওরে ১০ একর জমিতে আবাদ করেছিলেন কৃষক রতন মিয়া। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে করা এই ফসলের ওপরই নির্ভর করত তাঁর পুরো পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের লেখাপড়া।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারলাম না। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব আর সারা বছর পরিবার নিয়ে কী খেয়ে বাঁচব, তা জানি না।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এই পরিস্থিতির পেছনে মানবসৃষ্ট কারণও রয়েছে। হাওরে পরিবেশ আইন না মেনে উঁচু রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আব্দুল্লাহপুর গ্রামের কৃষক কামরুল হাসান বলেন, হবিগঞ্জ সীমান্তের খোয়াই নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় উজানের পানি নামলেই অষ্টগ্রাম অংশে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, পলি জমে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। দ্রুত পানি নেমে গেলে কিছুটা রক্ষা পাওয়া সম্ভব। অধিদপ্তর থেকে ইতিমধ্যে কৃষকদের ৮০ শতাংশ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি অফিসের তথ্যমতে, আজ পর্যন্ত হাওরের ৪৮ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে বাকি অর্ধেকের বেশি ফসল এখন প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভর করছে। বজ্রপাতের আশঙ্কা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান কাটার গতি থমকে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
প্রতিনিধি/একে