বিরল মশাবাহিত রোগের কাছে হার মানলেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) শিক্ষক অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি। চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ নামক এক মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, তাঁর ‘মাল্টিপল স্ট্রোক’ হয়েছিল। যদিও তাঁর শরীরে ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’-এর প্রায় সব উপসর্গই ছিল। এদিকে, বিরল এই রোগের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে এ আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
পারিবারিক, বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ মে সামান্য জ্বর অনুভব করেন ড. জুথি। সেই সঙ্গে ছিল প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও বমি। প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ ফ্লু মনে হলেও দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে প্রথমে এইচডিইউতে এবং পরে আইসিইউতে নেওয়া হয়। এ সময় মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তাঁর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে ভাইরাসটি তাঁর মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। হাসপাতালে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক ডা. কাউসারুল আলম জানান, “হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই শিক্ষকের ‘মাল্টিপল স্ট্রোক’ হয়। সময়ও পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকরা আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করেছেন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যান।”
এদিকে, এভারকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীকে যখন মেট্রোপলিটন হাসপাতাল থেকে স্থানান্তর করা হয়, তখন তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। পথিমধ্যে তাঁর ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হয় এবং তাঁকে প্রায় ৫-৬ সাইকেল সিপিআর দিতে হয়েছিল।
হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, “রোগী যখন আমাদের ইউনিটে পৌঁছান, তখন তিনি ক্লিনিক্যালি ব্রেইন ডেড ছিলেন। আইসিইউ সাপোর্টে রাখার পরও তাঁকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক উপসর্গ ও ক্লিনিক্যাল কন্ডিশন দেখে আমাদের সন্দেহ, এটি ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’।”
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, জাপানিজ এনসেফালাইটিস মূলত কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কে আঘাত করে। ড. জুথির ক্ষেত্রেও এই ভাইরাসের আক্রমণে ব্রেন স্ট্রোক হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রোগে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি এবং যারা বেঁচে থাকেন, তাঁদের অনেকেরই স্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়।
জানা গেছে, ড. জুথি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭-০৮ সেশনের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি জাপানের Hiroshima University থেকে পিএইচডি এবং Kyushu University থেকে পোস্ট-ডক সম্পন্ন করে দেশে ফেরেন। এ বছরের শুরুতেই তিনি সিভাসুর অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। তিনি সিভাসুর ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর স্বামী বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. শাহরিয়ার হাসেম অর্নব। তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।
এদিকে, অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির আকস্মিক মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও বিজ্ঞানীকে হারালো। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি।”
প্রতিনিধি/আরএইচ