গণতন্ত্র, জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার যত বেশি সংকুচিত হবে, গণমাধ্যমও তত বেশি চাপে পড়বে বলে মন্তব্য করছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে ব্যবসা ও রাজনীতির ক্রমবর্ধমান যোগসাজশ শুধু সুশাসনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, এর প্রভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরও পড়ছে।’
শনিবার (৮ মে) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর শেষ দিনে সকালের সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। এই সেশনে আলোচনার বিষয় ছিল ‘পলিটিকো-গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেম অ্যান্ড ফ্রি মিডিয়া’। সেশনটির সঞ্চালক ছিলেন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন। দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে সমস্যা নেই। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ব্যবসা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে ওঠে এবং রাজনীতি নিজেই ব্যবসায়িক বিনিয়োগে পরিণত হয়। রাজনীতি যখন ব্যবসা হয়ে যায় এবং ব্যবসা যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে একীভূত হয়, তখন তা জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে।’
আলোচনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো গণমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। এর কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থা মূলত পুঁজি, অর্থ, ধর্ম, পিতৃতন্ত্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের মতো কয়েকটি শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো গণমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। মিডিয়া মালিকানা, নীতিনির্ধারণ এবং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করছে।’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘জিরো সাম গেম’ (হার–জিতের খেলা, একজনের লাভ, আরেকজনের ক্ষতি) ধরনের সংস্কৃতি চালু রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ, ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্যপ্রবাহ সীমিত করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ এবং ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের প্রবণতার কারণে তথ্য প্রকাশ ও সমালোচনাকে অনেক সময় হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এ কারণে গণমাধ্যমের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি হয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান।
বক্তব্যে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ আইনে শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যাঁদের অনেকেই শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আনোয়ার শাকিল ও সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
দেশবার্তা/একে