ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হারের উদ্বেগ ও অসম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে সম্পদ গড়ার গতি বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে প্রতিদিন নতুন করে গড়ে ৮৯ জন অতি-উচ্চ সম্পদের অধিকারী বা অতি-ধনী হয়েছেন বলে নাইট ফ্রাঙ্কের ‘ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৬’-এ উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের ২০তম সংস্করণে দেখা গেছে, অতি-উচ্চ নিট সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি, যাদের নিট সম্পদের পরিমাণ অন্তত ৩ কোটি ডলার তাদের সংখ্যা ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ১ লাখ ৬২ হাজার ১৯১ জন বেড়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে এই শ্রেণির মানুষের মোট সংখ্যা ৫ লাখ ৫১ হাজার ৪৩৫ থেকে বেড়ে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
এই বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিগত সম্পদের একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে থাকলেও ভারত, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোও শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে।
২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অতি-ধনী হওয়া মোট ব্যক্তিদের ৪১ শতাংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে বিশ্বের মোট অতি-ধনীর মধ্যে দেশটির অংশ ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশ্ব সম্পদে তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ অতি-ধনী ব্যক্তি বসবাস করেন। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্পদের কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। পাশাপাশি এ অঞ্চলেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি বাস করেন।
নাইট ফ্রাঙ্ক জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৩ হাজার ১১০ জনে পৌঁছেছে।
এদিকে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ভারতে অতি-ধনীর সংখ্যা ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এ সংখ্যা আরও ২৭ শতাংশ বাড়বে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় আগামী পাঁচ বছরে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে অতি-ধনীর সংখ্যা ৮২ শতাংশ বাড়তে পারে। সৌদি আরব ও পোল্যান্ডের ক্ষেত্রে ৬৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, আর ভিয়েতনামে এ হার হতে পারে ৫৯ শতাংশ।
অস্ট্রেলিয়ার অতি-ধনীর সংখ্যা ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নাইট ফ্রাঙ্ক এ প্রবণতাকে দেশটির গভীর অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যও বিশ্বজুড়ে অতি-ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে তাদের অংশ বাড়িয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এ হার ২.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩.১ শতাংশ হয়েছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটি এ অবস্থান ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাইট ফ্রাঙ্কের গ্লোবাল হেড অব রিসার্চ লিয়াম বেইলি বলেন, এ ফলাফলগুলো বিশ্বজুড়ে সম্পদ তৈরি এবং তা বণ্টনের ধরনে একটি বড় পরিবর্তন দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সম্পদ বণ্টনের পরিবর্তন দেখছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রধান চালিকাশক্তি, তবে আমরা ভারত এবং একদল দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির উত্থানও দেখছি, যা এখন বিশ্ব পরিমণ্ডলকে নতুন রূপ দিচ্ছে। বিশাল ভূরাজনৈতিক ধাক্কা ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত পুঁজি অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। আমাদের সর্বশেষ ফলাফল বিশ্বজুড়ে সম্পদ তৈরির কাঠামোগত গতির প্রতিফলন ঘটায়।
প্রতিবেদনে পুঁজি চলাচলের একটি সুনির্দিষ্ট প্যাটার্নের দিকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সম্পদ এখন সেই শহরগুলোতে বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে যেখানে সুযোগ, স্থিতিশীলতা ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত থাকে।
বেইলি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কর সংস্কার ও কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কারণে পুঁজি এখন নির্দিষ্ট কিছু শহরে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যা সুযোগ ও স্থিতিশীলতা উভয়ই প্রদান করে। এই নতুন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ ধনী পরিবারগুলো বিভিন্ন কেন্দ্রে তাদের বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা সুযোগ, নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকারের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রায়ই লন্ডন, নিউইয়র্ক, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে তাদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখছে।
নাইট ফ্রাঙ্কের প্রাইভেট অফিসের চেয়ারম্যান ররি পেন বলেন, সম্পদ তৈরির এ হার এমন এক সময়ে বাড়ছে যখন বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের পরিবেশ পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একটি জটিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও সম্পদ গড়ার প্রবণতা বাড়ছে। অতি-ধনীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিচরণশীল। তবে যেখানে তারা বিনিয়োগ করতে বা পরিবার নিয়ে থাকতে সত্যিকার অর্থে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, এমন বাজারের তালিকা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। সূত্র: গাল্ফ নিউজ
দেশবার্তা/একে