পৃথিবীতে এসেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল শিশুটি। বয়স তখন মাত্র তিন দিন। দিনমজুর বাবার সামর্থ্য ছিল না ঢাকা বা বড় কোনো শহরে নিয়ে গিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানোর। তবে চিকিৎসকদের অদম্য ইচ্ছা, দায়িত্ববোধ আর মানবিকতায় শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেল ফুটফুটে শিশু মো. আদিয়ান। রাঙামাটি সদর হাসপাতালে প্রথমবারের মতো সম্পন্ন হলো অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ এক অস্ত্রোপচার।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজার এলাকার এক দিনমজুরের সন্তান আদিয়ান। সে এক জটিল জন্মগত ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘মায়েলোমেনিনগোসিল’ (Myelomeningocele)। এই রোগে শিশুর মেরুদণ্ডের হাড় সঠিকভাবে জোড়া না লাগায় স্নায়ুরজ্জু বা স্পাইনাল কর্ড বাইরে বের হয়ে থাকে। আদিয়ানের ক্ষেত্রে এটি জন্মের পরই ফেটে যায়।
চিকিৎসকেরা জানান, এটি ফেটে গেলে অনবরত স্নায়ুরস বের হতে থাকে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করে এটি বন্ধ করা না গেলে মস্তিষ্কে মারাত্মক সংক্রমণ (ইনফেকশন) হয়ে শিশুর মৃত্যু অবধারিত। গত রোববার (২৪ মে) আশঙ্কাজনক অবস্থায় আদিয়ানকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করে তার পরিবার।
সাধারণত জেলা সদরের হাসপাতালে এই ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার করা হয় না। কিন্তু শিশুর পরিবারের চরম আর্থিক ও সামাজিক অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে রাঙামাটির চিকিৎসকেরা এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন। সব সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে হাসপাতালেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা বলেন, আদিয়ানের অপারেশনটিতে শতভাগ মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল, আবার অপারেশন না করলেও নিশ্চিত মৃত্যু। চোখের সামনে শিশুটির এই অবস্থা আমরা মেনে নিতে পারছিলাম না।
পরিবারের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি (মুচলেকা) নিয়ে রোববার দুপুরে শুরু হয় অস্ত্রোপচার। পেডিয়াট্রিক সার্জন ডা. সবুজ কান্তি এবং অ্যানেশেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. সাগর নন্দীর নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল সফলভাবে এই জটিল সার্জারি সম্পন্ন করেন।
রাঙামাটি সদর হাসপাতালের ইতিহাসে এত ছোট শিশুর এমন জটিল অস্ত্রোপচার এটাই প্রথম।
ডা. নূয়েন খীসা বলেন, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে দিন দিন আমাদের সামর্থ্য ও সক্ষমতা বাড়াব। এই অস্ত্রোপচারটি আমাদের সীমাবদ্ধতার বাইরে ছিল। কিন্তু চিকিৎসকেরা কেবল দায়িত্ববোধ এবং সাধারণ প্রান্তিক জনগণের প্রতি অঙ্গীকার থেকে কাজটি করেছেন। তাঁরা আদিয়ানের পৃথিবীতে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করেছেন।
এই অনন্য ও মানবিক সাফল্যের জন্য সিভিল সার্জন এবং রাঙামাটি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. মুহাম্মদ শওকত আকবর খান হাসপাতালের পুরো সার্জারি টিমকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
একই সাথে চিকিৎসকদের এমন মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।
প্রতিনিধি/একে