গত (২৮ মে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা) থেকে কয়েক দিনের প্রচন্ড গরমে মানুষের কষ্ট হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর বহুমাত্রিক প্রভাবের মধ্যে অতিরিক্ত গরম ও তাপপ্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তাই তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মানুষকে রক্ষা করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।
তাপপ্রবাহ বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন কোনো অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় দীর্ঘ সময় ধরে অত্যধিক তাপমাত্রা বিরাজ করে। এ সময় মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে তাপপ্রবাহের প্রভাব বহুমুখী। কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক এবং খোলা আকাশের নিচে কর্মরত মানুষেরা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন। এতে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত গরমে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়, গবাদিপশুর উৎপাদন কমে যায় এবং পানির চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সচেতনতা সৃষ্টিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সাধারণ মানুষকে জানতে হবে কীভাবে অতিরিক্ত গরমের সময় নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়। প্রচুর পানি পান করা, ওরস্যালাইন গ্রহণ করা, হালকা ও সুতির পোশাক পরা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে রোদে বের না হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা উচিত। বাইরে যেতে হলে ছাতা, টুপি বা সানগ্লাস ব্যবহার করা প্রয়োজন।
গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলো এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তাপপ্রবাহ সম্পর্কিত সতর্কবার্তা ও করণীয় প্রচার করা উচিত। স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ ও জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাপপ্রবাহের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ অপরিহার্য। বেশি বেশি গাছ লাগানো, জলাশয় সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নগর এলাকায় সবুজায়ন বৃদ্ধি করলে তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জরুরি।
তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে সম্মিলিতভাবে সচেতন হতে হবে। যথাযথ প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী মো. নজরুল ইসলাম।