দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতি হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
ডেঙ্গু মোকাবেলার কঠিন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি কসম কেটে বলছি, আমি খুব নার্ভাস হয়ে গেছি। আমি খুব দুর্বল হয়ে গেছি। আমি কীভাবে এই ফাইটটা করব? আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু চিকিৎসায় মৃত্যুর বিষয়ে আমার কোনো হাত নেই।’
রোববার সকালে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আয়োজিত ‘ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার আয়োজনে এবং ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় এই কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবেলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের একার দায়িত্ব নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই লড়াইয়ে সম্পৃক্ত হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে চাপ দেওয়া সম্ভব হলেও, শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। মশা যেকোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে, তাই এটি একটি সমন্বিত ‘টোটাল ফাইট’। ১৯৭১ সালের মতো জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন না করলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।
ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়ন করাও জটিল। ব্যাপক ভ্যাকসিনেশনে যেতে হলে বিশাল বাজেটের প্রয়োজন হবে, যা স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তবে প্রতিরোধব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর করা কঠিন বিধায় সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিতের ওপরও জোর দেন তিনি।
চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু রোগীর প্লাজমা লিকেজ সময়মতো শনাক্ত করা এবং রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থার ওপর সতর্ক নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই লড়াই দেশের প্রতিটি অঞ্চলের চিকিৎসকদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করতে হবে।
সরকার ইতিমধ্যে সম্ভাব্য চাহিদা পূরণে প্রায় আড়াই লাখ স্যালাইন সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় মশক নিধন কার্যক্রম এখনো দৃশ্যমান মাত্রায় পৌঁছায়নি, যা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা এবং প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ প্লাজমা লিকেজ বেড়ে গেলে রোগী দ্রুত শকে চলে যেতে পারে।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, এবার ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। রোগীর প্লাটিলেট কাউন্টের চেয়ে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট বা তরল পদার্থের সঠিক নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ডেঙ্গুর উপসর্গেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে- অনেকে ডায়রিয়া ও বমি নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না, সঠিক নিয়মে বাসায় চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে আসতে হবে।
চিকিৎসা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণার বিষয়ে সতর্ক করে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান স্পষ্ট জানান, ডেঙ্গুতে স্টেরয়েড বা ব্যথানাশক ওষুধের কোনো ভূমিকা নেই। এমনকি প্লাটিলেট বাড়ানোর জন্য বহুল প্রচারিত পেঁপেপাতার ক্যাপসুলেরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
যারা আগে থেকে রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাচ্ছেন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দেশবার্তা/একে