গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) ২০২৬ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। এই তালিকায় ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) গত ৯ জুন এই বৈশ্বিক শান্তি সূচক প্রকাশ করে। এবারের সূচকে বাংলাদেশকে ‘মিডিয়াম’ বা মধ্যম শান্তির স্তরে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
বিশ্বের ৯৯.৭ শতাংশ জনসংখ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করে ১৬৩টি স্বাধীন রাষ্ট্র ও ভূখণ্ড নিয়ে জিপিআইয়ের ২০তম সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছে। মোট ১৬৩টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম এবং ৫-এর মধ্যে দেশের সার্বিক স্কোর ২.২২৬। মূলত সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং সামরিকীকরণ- এই তিনটি ক্ষেত্রে ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন সূচক ব্যবহার করে শান্তির এই হিসাব করা হয়েছে।
সূচকের নিয়ম অনুযায়ী, যার স্কোর যত কম, সেই দেশে শান্তির মাত্রা তত বেশি। সেই হিসেবে বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোরের চিত্রে দেখা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় ২.৫৭৯, চলমান সংঘাতে ২.২৩৭ এবং সামরিকীকরণে স্কোর ১.৬১৫।
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারও সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় ১৬তম স্থানে থাকা দেশটি এই অঞ্চলের একমাত্র রাষ্ট্র, যাদের শান্তির মাত্রাকে ‘উচ্চ’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক তালিকায় ৬৭তম অবস্থান নিয়ে এই অঞ্চলে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা এবং এর পরেই ১১১তম স্থানে আছে নেপাল।
অন্যদিকে, চলমান সংঘাতের সূচকে অবনতি হওয়ায় ‘নিম্ন’ শান্তির মাত্রায় নেমে গেছে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের অবস্থান পঞ্চম এবং বিশ্বে ১২৭তম। এছাড়া যথাক্রমে ১৫২ ও ১৫৭তম স্থানে থাকা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বরাবরের মতোই এই অঞ্চলের সবচেয়ে অশান্ত ও অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে একেবারে নিচের দিকে রয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে শান্তির সূচকে সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক পতনটি দেখেছে দক্ষিণ এশিয়াই। এই অঞ্চলের গড় শান্তির অবনতি হয়েছে ২.৩ শতাংশ। মূলত চলমান সংঘাতের কারণেই এই ধস নেমেছে, যা ৭.১ শতাংশ পর্যন্ত খারাপের দিকে গেছে। এর পেছনে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সীমান্ত-উত্তেজনা।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টানা ১৯ বছরের মতো সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। শীর্ষ তালিকায় তাদের ঠিক পরেই অবস্থান করছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড।
অপরদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ দেশের তকমা জুটেছে রাশিয়ার। সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাশিয়ার ঠিক পরেই রয়েছে সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অভ কঙ্গো, ইউক্রেন ও ইসরায়েল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে বৈশ্বিক শান্তির মাত্রা কমেছে ০.৭ শতাংশ। এ নিয়ে টানা ১২ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে শান্তির সূচকে ধারাবাহিক অবনতি দেখা গেল। মূল্যায়নের আওতায় থাকা ১৬৩ দেশের মধ্যে ৯৯টি দেশেই শান্তির অবনতি ঘটেছে, বিপরীতে উন্নতি হয়েছে মাত্র ৬২টি দেশে।
জিপিআইয়ের এই প্রতিবেদনে ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকির দিকটিও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশকে রপ্তানিমুখী জ্বালানি আমদানিকারক হিসেবে চিহ্নিত করে আইইপি জানিয়েছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চড়া দাম ও বিশ্ববাজারে চাহিদার পতনের কারণে দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত হুমকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, আর্থিক রাজস্ব ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলকভাবে নিম্নমুখী।
প্রতিবেদনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সংকট যদি আরও ঘনীভূত হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় জিডিপির ১.৫ থেকে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। চরমভাবাপন্ন পরিস্থিতিতে প্রথম বছরেই বৈশ্বিক জিডিপি ০.৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, যার সবচেয়ে নির্মম শিকার হবে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো।
দেশবার্তা/একে