পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ভূমি সমস্যায় জর্জরিত রাখাইন আদিবাসীদের সার্বিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন পাড়া পর্যবেক্ষণ করেছে ‘সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস্’ নামের একটি নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি দল। গত শুক্রবার (১২ থেকে) থেকে রোববার (১৪ জুন) পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী এই পর্যবেক্ষণে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা স্থানীয় বৌদ্ধ বিহার, শ্মশান এবং উচ্ছেদকৃত রাখাইন পরিবারগুলোর পুনর্বাসন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।
প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, রান-এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম, গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা এবং ল্যান্ড ইজ লাইফ (Land is Life)-এর এশিয়া প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সতেজ চাকমা প্রমুখ।
ঢাকা থেকে আসা প্রতিনিধি দলটি গত শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে কুয়াকাটার ঐতিহাসিক শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন- শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি উ চো রাখাইন, বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মং চৌ থিন তালুকদার, বিহার অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু এবং কারিতাস বাংলাদেশের প্রতিনিধি মং ম্য রাখাইন।
মতবিনিময় সভায় বিহারের ভূমির দুর্দশার কথা তুলে ধরে ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু বলেন, ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ আমলে ২ একর ৪৪ শতাংশ জায়গায় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬২ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণের সময় বিহারের অনেক জায়গা নেওয়া হয় এবং এরপর থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিহারের জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছে। বর্তমানে বিহারের দখলে রয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ জমি। নিজস্ব ভূমি সংরক্ষণ করা না হলে এই ঐতিহ্যবাহী বিহারের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পটুয়াখালী জেলার একমাত্র ‘সীমা বিহার’ এটি, যেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জীবনাচরণ ও উপসম্পদা গ্রহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সীমাঘর’ অবস্থিত। পাউবো এই জায়গা নিয়ে নিলে সীমাঘরটি বিলুপ্ত হবে, যা রাখাইনদের ধর্মীয় জীবনযাপনে মারাত্মক আঘাত হানবে।
এরপর প্রতিনিধি দলটি মিশ্রিপাড়ার প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন করে।
বিহারের অধ্যক্ষ উত্তমা মহাথেরো জানান, ২ একরের বেশি আয়তনের এই বিহারটির অনেক জায়গা এখনও রেকর্ডভুক্ত না হওয়ায় প্রভাবশালী মহল তা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন পটুয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক মং হ্লা সেইন রাখাইন অভিযোগ করেন, রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু অসৎ কর্মচারীর যোগসাজশে বাঙালিরা জাল দলিলের মাধ্যমে রাখাইনদের জমি দখল করছে। অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীরা ২ একর জমি বিক্রি করলে প্রভাবশালীরা ৫ একর জমি বুঝিয়ে নেয়। আদালতের রায় থাকার পরও অনেক জমি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।
কুয়াকাটা উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামে রাখাইন আদিবাসীদের শ্মশানভূমির জায়গা বেদখল করে গাছ লাগানোর অভিযোগ উঠেছে বাবুল আখতার নামের এক স্থানীয় বাঙালির পরিবারের বিরুদ্ধে।
বাবুল আখতার জানান, জায়গাটি ৪০-৫০ বছর আগে তাঁর দাদা রাখাইনদের কাছ থেকে কিনেছিলেন। তবে শ্মশানের গাছ লাগানো অংশটি তাঁদের কিনা সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষ জমি মেপে দ্রুত একটি পারস্পরিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আশ্বাস দেন।
এদিকে, ২০২১ সালে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ছ-আনি পাড়া গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া ছয়টি রাখাইন পরিবারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এখনও ঝুলে রয়েছে।
উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের প্রতিনিধি চিং দামো রাখাইন জানান, প্রাথমিক উচ্ছেদের সময় আপত্তি জানানো হলেও প্রশাসন তা শোনেনি। পুকুর, গাছ ও ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬ পরিবারকে ৯৬ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় এবং স্থায়ী পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত মাসিক ৫ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাত্র ৬ মাস পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠির সূত্রে জানা যায়, এই পরিবারগুলোর জন্য কলাপাড়ার সোনাপাড়া মৌজায় ৪০ শতাংশ জমি কেনা হবে।
তবে প্রতিনিধি দল পুনর্বাসন এলাকায় গিয়ে দেখতে পান, জমির সীমানা নির্ধারণ (ডিমারকেশন) করা হলেও মাটি ভরাট ও ঘর তৈরির কাজ এখনও বাকি। চলতি জুন মাসেই এই পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চলায় উচ্ছেদকৃত রাখাইন পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটি স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিকের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
সভায় বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মং চৌথিন তালুকদার রাখাইনদের সুরক্ষায় ৫ দফা দাবি পেশ করেন।
দাবিগুলো হলো- কলাপাড়ায় রাখাইনদের জন্য শ্মশানের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া; রাখাইন কালচারাল একাডেমি দ্রুত সংস্কার ও চালু করা এবং রাখাইন মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; রাখাইনদের বেদখল হওয়া ভূমি ও শ্মশান পুনরুদ্ধার এবং হয়রানিমূলক মামলা নিষ্পত্তি করা; রাখাইন তাঁতশিল্পের বিকাশে প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা করা; পায়রা বন্দরের কারণে উচ্ছেদ হওয়া ৬টি উদ্বাস্তু পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে ঘর তৈরি ও ভূমির মালিকানা হস্তান্তর করা।
আলোচনা শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিক উত্থাপিত দাবিগুলোর সাথে একমত পোষণ করেন এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, রাখাইনদের ভূমি রক্ষায় প্রশাসন অত্যন্ত আন্তরিক। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রায়ই জাল দলিলের মাধ্যমে আদিবাসীদের জমি দখলের চেষ্টা করে, যা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
এছাড়া তিনি কালচারাল একাডেমি দ্রুত চালু করা, তাঁতশিল্পে সহায়তা এবং পর্যটকদের জন্য একটি রাখাইন রেস্তোরাঁ চালুর উদ্যোগের কথা জানান।
উল্লেখ্য, আজ (১৪ জুন) প্রতিনিধি দলটি ছ-আনি পাড়ার উদ্বাস্তু রাখাইন আদিবাসীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তি
দেশবার্তা/একে