মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে উভয় পক্ষ। এই চুক্তির খবরে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে স্বস্তির ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও।
যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ঘোষিত এই প্রাথমিক চুক্তিতে আসলে কী কী থাকছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান যা জানিয়েছে-তা নিচে তুলে ধরা হলো-
সামরিক অভিযান বন্ধ ও চুক্তি সই
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, উভয় পক্ষই অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। সব পক্ষই নিশ্চিত করেছে যে, যুদ্ধ অবসানের এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী বলেছেন, সই হওয়ার পরই সমঝোতা স্মারকটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
হরমুজ প্রণালি ও বন্দর উন্মুক্তকরণ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পরপরই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিশ্চিত করেছেন, আগামী শুক্রবারই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং তিনি ইতিমধ্যেই ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চুক্তি সইয়ের পর প্রণালিটি ‘সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য’ উন্মুক্ত হবে।
আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের মাধ্যমে এই প্রণালির সামুদ্রিক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ
উভয় পক্ষ জানিয়েছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তেহরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম (যেমন- ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক স্থাপনার সম্প্রসারণ) স্থগিত রাখবে।
ভবিষ্যতের একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আওতায় ইরান দেশের ভেতরের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তরলীকৃত করতে পারবে বলে ওয়াশিংটন সম্মত হয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক উপকরণের মজুত সরিয়ে নেওয়ার কোনো তাড়াহুড়ো নেই, পরিস্থিতি ‘সব শান্ত হলে’ যুক্তরাষ্ট্র তা উদ্ধার করবে।
তবে যেকোনো চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর একটি শক্তিশালী পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা হবে বলে ট্রাম্প জানালেও এর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো স্পষ্ট করেননি।
কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে
মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তিকে অবশ্যই মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনা এবং অনুমোদন পেতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জব্দ সম্পদ অবমুক্তকরণ
ইরানি কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না যুক্তরাষ্ট্র। নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ইরানের ওপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির পর সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী মার্কিন ও জাতিসংঘের সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
আর্থিক বিষয়ে ওই কর্মকর্তা জানান, সরাসরি নগদ অর্থ স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর মাঝে সহযোগিতা এবং আর্থিক ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে ইরানের জব্দ থাকা ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করে দিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে, যা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অর্থনৈতিক বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন সুর মিলিয়ে বলেছেন, ইরানকে কোনো নগদ অর্থ দেওয়া হবে না, তবে নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া হতে পারে।
লেবানন পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, সামরিক অভিযান বন্ধের এই সিদ্ধান্তের মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবালয় জানিয়েছে, লেবাননসহ সব জায়গায় সোমবার রাত থেকেই স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জোর দিয়ে বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং এই রূপরেখা চুক্তি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
সমঝোতা স্মারক ঘোষণার আগে ট্রাম্পও বলেছিলেন, তিনি লেবাননসহ ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনবেন। লেবাননে আর কোনো ইসরায়েলি হামলা হওয়া উচিত নয় এবং ইসরায়েলের ওপর ইরান-সমর্থিত লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকেও কোনো হামলা চালানো যাবে না বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেন।
ইসরায়েলের ভিন্ন অবস্থান
এদিকে এই যুদ্ধবিরতি ও চুক্তির আবহের মধ্যেই ভিন্ন সুর শোনা গেছে ইসরায়েলের কণ্ঠে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় তাদের দখল করা নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অবস্থান বজায় রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
উভয় পক্ষই জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানের এই প্রাথমিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর, বিরোধের আরও জটিল বিষয়গুলো- বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে পরবর্তী ৬০ দিন ধরে উভয় পক্ষ নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাবে। (তথ্যসূত্র: রয়টার্স)
দেশবার্তা/একে