রাজধানী ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের বহুমাত্রিক পরিকল্পনার কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার সংসদের অধিবেশনে বিএনপির সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই পরিকল্পনার কথা জানান। বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠক শুরু হয়। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী লিখিত প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সম্পূরক প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, রাজধানী ঢাকাকে ‘ক্লিন’ ও ‘গ্রিন’ নগরী রূপে গড়ে তুলতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার রোড মিডিয়ান, সড়কদ্বীপ ও উন্মুক্ত স্থানগুলো সবুজায়নের লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন কোরিয়াভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তর করার মাধ্যমে সব বর্জ্যকে ‘জিরো’ বর্জ্যতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় নগর বনায়ন (মিয়াওয়াকি ফরেস্ট) উন্মুক্ত মিডিয়ান জিরো সয়েল-সবুজে আবৃত করা হচ্ছে। সিটির আওতাধীন এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ বৃক্ষোরপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেলের নিচের খালি অংশ (মিরপুর ১২ নম্বর থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত) এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (আবদুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত) নিচের খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করা হবে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ঢাকা শহরের পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ঢাকার বায়দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে আধুনিক বাস সার্ভিস এবং ২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে। কালো ধোঁয়া নির্গমণকারী যানবাহন, কনস্ট্রাকশন কার্যক্রম ও নির্মাণসামগ্রী দ্বারা বায়ূদূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা শহরের বায়ূদূষণ রোধে ঢাকার চারদিকে অবৈধ দূষণকারী ইটভাটাগুলো বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ঢাকার আশপাশে ইটভাটা নিষিদ্ধ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মহানগরীর বায়ূদূষণ কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা জেলার সাভার উপজেলাকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড ঘোষণা করা হয়েছে। এই এলাকায় ইটভাটার কার্যক্রম পরিচালনা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো ইত্যাদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের নদী–খাল–জলাশয় দূষণরোধে তরল বর্জ্য নির্গমণকারী প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৪৮টি ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। স্থাপিত ইটিপি রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণের জন্য ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) ক্যামেরা স্থাপন চলমান।
ঢাকা মহানগরে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তুলতে বনায়নযোগ্য খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি আশা করছেন, এসব কার্যক্রম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা শহর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সংসদ সদস্য আবুল কালামের সম্পূরক প্রশ্নে রাজধানীমুখী মানুষের স্রোত কমানোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের সব সুযোগ-সুবিধা, চাকরি-বাকরি, চিকিৎসা, পড়ালেখাসহ সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে। এটা এক দিন-দুই দিন না, এটি বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। সারা দেশকে ঘিরে সুবিধাগুলো গড়ে তোলা হয়নি। সে কারণে স্বাভাবিকভাবে সারা দেশ থেকে মানুষ ঢাকামুখী হয়ে থাকে। সেটি কর্মসংস্থানের সুবিধার জন্য হোক, সন্তানদের লেখাপড়ার জন্যই হোক, আর পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যই হোক।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আছে দেশের সব অংশে পর্যায়ক্রমিকভাবে মৌলিক সুবিধা গড়ে তোলা। বর্তমান সরকার দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ করছে। একই সঙ্গে চেষ্টা করছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসাসেবা গড়ে তুলতে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখাপড়ার জন্য ধীরে ধীরে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়া। এসব সুবিধা যদি গড়ে তোলা যায়, তাহলে মানুষ ঢাকা শহরে আসার জন্য কম উৎসাহিত হবে। ধীরে ধীরে ঢাকার ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।
‘বাইপাসকে বাইপাস করার জন্য আরেকটা বাইপাস দরকার’
ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য কামরুল হাসানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ময়মনসিংহের শহরের পরিধি বেড়েছে। আপনি যে বাইপাসের কথা বললেন, আমার নিজ জেলায় (বগুড়া) একটি বাইপাস আছে, যেটি শহরকে বাইপাস করে চলে গেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সে বাইপাসের দুই পাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এখন মনে হচ্ছে, বাইপাসকে বাইপাস করার জন্য আরেকটা বাইপাস দরকার। হয়তোবা ময়মনসিংহ রেলস্টেশন শহর থেকে অন্যদিকে নেওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের দেশ আয়তনে ছোট। অনেকগুলো বিষয় চিন্তা করতে হয়। জমি নষ্ট করবেন কি না, অর্থ ব্যয় করবেন কি না, সবকিছু বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। সব শহরের জন্যই বড় পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
দেশবার্তা/একে