আকাশের ‘আকাশি’ আর মেঘের ভেলার ‘সাদা’ রং—এ দুইয়ে মিলেই আর্জেন্টিনার ট্রেডমার্ক জার্সি। ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা জার্সির মাহাত্ম্য খোদ ফুটবলার থেকে শুরু করে সমর্থক—সবার কাছেই অন্য রকম এক আবেগ।
আর্জেন্টিনার জার্সি প্রস্তুত করে থাকে জার্মানির ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। মাঝের তিন বছর (১৯৯৯-২০০১) বাদ দিয়ে বিশ্বখ্যাত এই ব্র্যান্ডের জার্সি গায়ে দিয়ে সেই ১৯৯০ বিশ্বকাপ থেকে এখন পর্যন্ত খেলে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা।
আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপেও স্বভাবতই আর্জেন্টিনার চিরাচরিত নকশা রাখা হয়েছে তাদের জার্সিতে। যেখানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা ডোরাকাটা নকশা। এ ছাড়া আলবিসেলেস্তেদের শিরোপাজয়ী ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২ তিন আসরে পরিহিত জার্সির সঙ্গে এর সমন্বয় করা হয়েছে।
নীল থেকে কালো শর্টসের রূপান্তর
১৯৩০ বিশ্বকাপ থেকেই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের গায়ে শোভা পেত এই আকাশি-সাদা জার্সি। তবে তখন জার্সির সঙ্গে শোভা পেত ঘন নীল রঙের শর্টস (প্যান্ট)। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের পর থেকে গাঢ় নীল শর্টস বাদ দিয়ে কালো শর্টস পরে খেলা শুরু করেন দেশটির ফুটবলাররা।
ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত নীল জার্সির ইতিহাস
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দিয়াগো ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে ওই আকাশি-সাদা ডোরাকাটা জার্সির পরিবর্তে গাঢ় নীল রঙের জার্সি পরে নামতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে।
মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইনদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সেখানকার অতিরিক্ত তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা। আকাশি-সাদা ডোরাকাটা মূল জার্সিতে খুব একটা সমস্যা না হলেও বিপত্তি বাঁধে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় (অ্যাওয়ে) জার্সি নিয়ে। ভারী কাপড়ের সেই গাঢ় নীল জার্সি পরে অতিরিক্ত গরমের মধ্যে খেলা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
মেক্সিকোর দোকান থেকে কেনা জার্সি!
পাতলা কাপড়ের নতুন জার্সি বানিয়ে আনার মতো পর্যাপ্ত সময়ও তখন হাতে ছিল না। তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলার্দো তখন তাঁর সহকারীকে পাঠালেন মেক্সিকো সিটির দোকানগুলোতে। উদ্দেশ্য—যদি নীল রঙের একটু আরামদায়ক ও পাতলা কাপড়ের জার্সি খুঁজে পাওয়া যায়।
সহকারী কোচ রুবেন মোশেল্লা বাজার ঘুরে অপেক্ষাকৃত দুটি পাতলা জার্সি নিয়ে হাজির হলেন। সেখান থেকে একটি জার্সি হাতে নিয়ে তৎকালীন অধিনায়ক দিয়াগো ম্যারাডোনা বলে উঠলেন, ‘এটা গায়ে জড়িয়েই আমরা ইংল্যান্ডকে হারাব।’
যেমন কথা, তেমন কাজ। সেই দোকান থেকেই তড়িঘড়ি করে আরও ৩৮টি ওই রকম সাধারণ নীল জার্সি কিনে আনা হলো। এরপর রাতারাতি প্রতিটিতে সেলাই করে লাগানো হলো আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (AFA) ব্যাজ। কয়েক ঘণ্টা পরেই সেই জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা দল।
আর সেদিনের সেই কোয়ার্টার ফাইনালে কী হয়েছিল তা তো ফুটবল ইতিহাসের চিরন্তন অংশ। ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—দুটো গোলের মাধ্যমেই ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছে মেক্সিকোর গলি-ঘুপচি ঘুরে বের করে আনা সেই সাধারণ নীল রঙের পাতলা জার্সিটি।
দেশবার্তা/একে