প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে বসছে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। এর মধ্যে কানাডায় প্রথমবারের মতো ফিফার এই মেগা ইভেন্টের সহ-আয়োজক হবে ২০২৬ আসরে। আর যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় ও মেক্সিকো সর্বোচ্চ তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকোয় এর আগে এককভাবে ফুটবলের সর্বোচ্চ এই টুর্নামেন্ট হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার ১৯৯৪ সালে ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক হয়েছিল। ৩২ বছর পর সেখানে মেগা ইভেন্টটি ফিরছে আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিসরে। আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত তিন দেশের ১৬টি ভেন্যুতে টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ বছর আগে-পরের দুই বিশ্বকাপ আসরে কত পরিবর্তন ও বিস্তৃতি এসেছে তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক–
টিকিটের দাম
১৯৯৪ : প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম ছিল ২৫ থেকে ৭৫ ডলার (উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য ৪০ থেকে ১২০ ডলার) ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনার রোজ বোল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে টিকিটের দাম ছিল ১৮০ থেকে ৪৭৫ ডলার পর্যন্ত।
২০২৬ : ফিফা ডিসেম্বরে একক ম্যাচের টিকিট বিক্রি শুরু করলে প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলোর দাম ছিল ১৪০ থেকে ২৭৩৫ ডলার। ফাইনালের টিকিটের দাম ছিল ৪১৮৫ থেকে ৮৬৮০ ডলার পর্যন্ত। এই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’, অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম পরিবর্তন হবে। এপ্রিল মাসে ফিফা ফাইনালের সর্বোচ্চ টিকিট মূল্য বাড়িয়ে ১০৯৯০ ডলার করেছে। প্রতিটি ধাপে আকাশচুম্বী টিকিটমূল্য নিয়ে সমালোচনার অন্ত নেই।
টুর্নামেন্টের আকার
১৯৯৪ : বিশ্বকাপের ১৫তম আসর হয়েছিল ২৪ দলের অংশগ্রহণে, ওই আসরের পর বিশ্বকাপের প্রতিযোগী বেড়ে যায়। ১৯৯৮ আসরে দলসংখ্যা বেড়ে ৩২ হয়।
২০২৬ : প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ৪৮ দল নিয়ে এবং নতুন করে ‘রাউন্ড অব ৩২’ যুক্ত হয়েছে। ম্যাচসংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪–এ। ফাইনালে ওঠা দলগুলো খেলবে আটটি ম্যাচ, যা আগের (৭ ম্যাচ) চেয়ে বেশি।
মাঠের আকার
১৯৯৪ : সে সময় ফিফা মাঠের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ যথাক্রমে ৬৮ ও ১০৫ মিটার (৭৪ ও ১১৫ গজ) নির্ধারণ করেছিল। তবে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ চাইলে কিছু ক্ষেত্রে মাঠ ছোট রাখার অনুমতি ছিল।
২০২৬ : এবার সব স্টেডিয়ামকে নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরিবর্তন করা হয়েছে।
দর্শক উপস্থিতি
১৯৯৪ : ওই বিশ্বকাপে রেকর্ড ৩৫ লাখ ৯০ হাজার দর্শক উপস্থিত হয়েছিল। ৫২ ম্যাচে গড় দর্শক ছিল ৬৮ হাজার ৯৯১ জন।
২০২৬ : এবার ম্যাচ সংখ্যা (১০৪) দ্বিগুণ হওয়ায় মোট দর্শক উপস্থিতি ৬০ থেকে ৭০ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভৌগোলিক পরিসর
১৯৯৪ : বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ৯টি স্টেডিয়ামে। শিকাগোর সোলজার ফিল্ডে উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৬ : এবার ১৬টি স্টেডিয়াম ব্যবহার করা হচ্ছে– যুক্তরাষ্ট্রে ১১, মেক্সিকোয় ৩ এবং কানাডায় ২টি। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে সব ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে। এবার শিকাগো নেই, ফিফার কাছ থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক নিশ্চয়তা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে শহরটি আয়োজনে আগ্রহ দেখায়নি।
বিলাসবহুল আয়োজন
১৯৯৪ : বিশ্বকাপের জন্য ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) পাঁচটি স্টেডিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল বর্তমানে ভেঙে ফেলা জায়ান্টস স্টেডিয়াম, ফক্সবোরো স্টেডিয়াম, পন্টিয়াক সিলভারডোম ও আরএফকে স্টেডিয়াম।
২০২৬ : এবার যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি ভেন্যুই এনএফএল স্টেডিয়াম, যেখানে রয়েছে প্রচুর বিলাসবহুল স্যুট ও প্রিমিয়াম আসন। ১৯৯৪ সালের ভেন্যুগুলোর মধ্যে শুধু সোলজার ফিল্ড, রোজ বোল, কটন বোল, সিট্রাস বোল ও স্ট্যানফোর্ড স্টেডিয়াম এখনও রয়েছে। তবে সেসবের কোনোটিই এবার থাকছে না।
পানি পানের বিরতি
১৯৯৪ : গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যেও দলগুলো বিরতি ছাড়া পুরো ম্যাচ খেলত।
২০২৬ : এবারও গরম ও আর্দ্রতা থাকবে, তবে প্রতি অর্ধে পানি পানের বিরতি থাকবে তিন মিনিট করে। কোচরা এই সময় দ্রুত কৌশলগত নির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বদলি খেলোয়াড়
১৯৯৪ : প্রতিটি দল দুইজন বদলি খেলোয়াড় ব্যবহার করতে পারত। এই নিয়ম চালু হয়েছিল ১৯৯০ বিশ্বকাপে। নতুন নিয়মে লাল কার্ড পাওয়া বা আহত গোলরক্ষকের ক্ষেত্রে তৃতীয় বদলির সুযোগ ছিল। ১৯৯৮ থেকে সাধারণভাবে তৃতীয় বদলি এবং অতিরিক্ত সময়ে ২০১৮ থেকে চতুর্থ বদলির সুযোগ চালু হয়।
২০২৬ : ২০২২ সাল থেকে প্রতিটি দল পাঁচজন বদলি খেলোয়াড় ব্যবহার করতে পারে। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে ষষ্ঠ বদলির সুযোগ রয়েছে এবং মাথায় আঘাত পাওয়া খেলোয়াড়ের বদলে যেকোনো সময় অতিরিক্ত একজন বদলি করা যাবে।
জার্সির নাম
১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকেই খেলোয়াড়দের নাম জার্সির পেছনে লেখা শুরু হয় এবং পরে এটি ফুটবলের নিয়মিত অংশ হয়ে যায়। জার্সি নম্বর বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল ১৯৫০ বিশ্বকাপে। ১৯৫৪ সাল থেকে পুরো টুর্নামেন্টে একই নম্বর ব্যবহারের নিয়ম চালু হয়। ১৯৭৪ থেকে শর্টসে নম্বর এবং ১৯৯৪ থেকে জার্সির সামনেও নম্বর বাধ্যতামূলক হয়।
পরিচালনায় কারা?
১৯৯৪ : ২০২২ বিশ্বকাপ পর্যন্ত স্থানীয় আয়োজক কমিটিই মূলত বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পালন করত। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন অ্যালান রোথেনবার্গ, তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার একজন আইনজীবী ও যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক প্রধান। তিনি দেশজুড়ে ঘুরে বিশ্বকাপের প্রচারণা চালান।
২০২৬ : এবার সরাসরি বিশ্বকাপ পরিচালনা করছে ফিফা। সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টায় সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যক্তি হিসেবে সামনে এসেছেন। এমনকি ট্রাম্পকে ফিফার একটি বিতর্কিত শান্তি পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে।
দেশবার্তা/একে