সচিবালয়ের দাপ্তরিক আবাসন সংকট দূরীকরণ এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তাবিত ‘২১ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্প’ অনুমোদন দেয়নি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
রোববার (২৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপিত হলেও মূলত চারটি ত্রুটির কারণে এটি আবার পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও একনেক সূত্র জানিয়েছে, ৬৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি নির্মাণ ব্যয় যাচাই, মাটি পরীক্ষা এবং নকশা পুনর্মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
অনুমোদন না পাওয়ার ৪ কারণ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একনেক সভায় প্রকল্পটি পর্যালোচনাকালে মূলত চারটি প্রধান ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে—
১. রিভিউ কমিটির অনুমোদনের অভাব: উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনার জন্য সরকার গঠিত ‘বিশেষ প্রকল্প রিভিউ কমিটি’র পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়নি।
২. অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয়: প্রকল্পের প্রস্তাবিত উচ্চ ব্যয় যৌক্তিক কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং এটি অধিকতর যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
৩. নকশা ও কাঠামোগত ত্রুটি: ভবনের সামগ্রিক কাঠামোগত নকশা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হয়নি।
৪. মাটি পরীক্ষার অভাব: এত বিশাল স্থাপনা নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় নিবিড় সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়নি।
রিভিউ কমিটির আপত্তি
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার জন্য ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে একটি বিশেষ রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির পক্ষ থেকে প্রকল্পের বেইজমেন্ট নির্মাণ, ভ্যাট এবং প্রতি বর্গমিটারের উচ্চ নির্মাণ খরচ নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।
কমিটির মতে, পুরনো ১ নম্বর ভবন (ক্যাবিনেট ভবন) ভেঙে নতুন স্থাপনা করার আগে এর প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের খাতগুলো পুনঃনিরীক্ষণ করা অপরিহার্য।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপট ও বৈশিষ্ট্য
সচিবালয়ের বর্তমান ১ নম্বর ভবনটি ১৯৩৯ সালে নির্মিত, যা ৮৭ বছরের পুরনো এবং রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় নয়। এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের স্থলেই আধুনিক ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ২১ তলা ভবনে ৪টি বেজমেন্ট, ১৪টি লিফট (ফায়ার ও বেড লিফটসহ), ২ হাজার ৪০০ টনের কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ২০টি আধুনিক কনফারেন্স রুম থাকার কথা ছিল। এছাড়া নতুন এই ভবনে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা থেকে শুরু করে অগ্নিনির্বাপণে অত্যাধুনিক সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।
প্রতি বর্গফুটে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩,৫০০.৮৬ টাকা (ভ্যাট ও ট্যাক্স বাদে), যেখানে বেজমেন্ট অংশের জন্যই নির্মাণ ব্যয় হবে প্রতি বর্গফুটে ৭৫৯.৬৫ টাকা। এছাড়া অগ্নি-নিরাপত্তা, সোলার প্যানেল এবং রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও এতে যুক্ত করার প্রস্তাব ছিল।
উপদেষ্টার বক্তব্য
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, প্রকল্পটি আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পুনরায় রিভিউ কমিটিতে যাবে। যেহেতু এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ, তাই একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে রিভিউ কমিটির আনুষ্ঠানিক সুপারিশ প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, সচিবালয়ে বর্তমানে ১৯৩৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নির্মিত মোট ১২টি ভবন রয়েছে। কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও অফিস স্পেসের ঘাটতি মেটাতে সচিবালয় আধুনিকায়নের এই মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে কারিগরি ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই একনেক আপাতত প্রকল্পটি স্থগিত রেখেছে। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
দেশবার্তা/একে