পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে শেরপুর জেলায় কোরবানির পশু প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও প্রান্তিক কৃষকরা। জেলার পাঁচ উপজেলার ছোট-বড় খামার ও পারিবারিক পর্যায়ে লালন-পালন করা গবাদিপশু মিলিয়ে এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৯১ হাজার ৭৩৮টি পশু।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৬৩ হাজার ৭৪০টি। ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত পশু দেশের বিভিন্ন জেলার হাট-বাজারে বিক্রি করা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, জেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩ হাজার ৭৩১ জন খামারি রয়েছেন। এছাড়া অসংখ্য পরিবার গরু, মহিষ ও ছাগল পালন করছেন। এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড় এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে লালন-পালন করা দেশি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিকাজের পাশাপাশি গবাদিপশু পালন তাদের আয়ের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে।
খামারিরা জানান, পাহাড়ি এলাকায় পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস ও লতাপাতা থাকায় গরু পালনে অতিরিক্ত খাদ্য খরচ তুলনামূলক কম হয়। প্রতিদিন ভোরে গরু নিয়ে পাহাড়ে যান তারা। সারাদিন খোলা চারণভূমিতে ঘাস ও লতাপাতা খেয়ে সন্ধ্যায় গরু নিয়ে বাড়ি ফেরেন। প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব গরুর মাংস সুস্বাদু হওয়ায় কোরবানির বাজারে এর চাহিদাও বেশি।
প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু শ্রীবরদী উপজেলাতেই এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ২০ হাজার ১১০টি পশু। এর মধ্যে রয়েছে ৯ হাজার ৭২০টি ষাঁড়, ৩৮০টি বলদ, ৬ হাজার ১০০টি গাভী, ১৪৫টি মহিষ, ৩ হাজার ৫১০টি ছাগল ও ২৫৫টি ভেড়া।
গজনি এলাকার কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে কয়েকটি গরু পালন করেছি। আশা করছি এবার ভালো দাম পাব। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসা বন্ধ করা গেলে স্থানীয় খামারিরা আরও লাভবান হবেন।
নালিতাবাড়ীর পানিহাতা এলাকার খামারি মিজান মিয়া বলেন, প্রতিবছর ঈদকে সামনে রেখে দেশি গরু পালন করি। এবারও কয়েকটি গরু বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেছি। আমাদের গরুর মাংসের স্বাদ আলাদা। বাজারেও এসব গরুর চাহিদা অনেক বেশি।
শ্রীবরদী উপজেলার পুরান শ্রীবরদী গ্রামের খামারি সাগর আলী বলেন, খড়, খৈল, ভুষি ও কাঁচা ঘাস খাইয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে গরু মোটাতাজা করেছি। এতে খরচ কিছুটা বেশি হলেও ঝুঁকি নেই। ক্রেতারাও এমন গরুর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখান।
পৌর শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার খামারি সুন্দর আলী বলেন, এবার ৬টি গরু মোটাতাজা করেছি। গরুর কোনো সমস্যা হলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে পরামর্শ ও চিকিৎসা নিচ্ছি। তবে গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় খরচও বেড়েছে। তারপরও আশা করছি কোরবানিতে ভালো দাম পাওয়া যাবে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মেহেদী হাসান বলেন, উপজেলায় প্রায় চার শতাধিক ছোট-বড় প্রান্তিক খামারি রয়েছে। তাদের খামারের নিয়মিত খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে খামারিরা প্রাকৃতিক ও নির্ভেজাল পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন করছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানুল হক ভুঁইয়া বলেন, পাহাড়ি এলাকার গরুগুলো সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ এসব গরু মোটাতাজা করতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করা হয় না। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন ক্রেতাদের কাছে পাহাড়ি গরুর চাহিদা বেশি। ইতোমধ্যে অনেক পাইকার পাহাড়ি এলাকা থেকে গরু কিনে নিয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন যাতে গরু মোটাতাজাকরণে কোনো ধরনের ক্ষতিকর ওষুধ বা ইনজেকশন ব্যবহার না করা হয়।
শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা আহমেদ বলেন, স্থানীয় কৃষকদের লাভের কথা বিবেচনা করে গরু চোরাচালান বন্ধে আমরা তৎপর রয়েছি। বিজিবি ও পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
প্রতিনিধি/একে