শীতের কুয়াশায় মোড়ানো সেই সকালটা যেন অর্ণবের জীবনের মতোই ধূসর হয়ে উঠেছিল। বহুদিন পর নিজের ছোট্ট শহরে ফিরে এসে সে দাঁড়িয়ে ছিল পুরনো বটগাছটার সামনে—যেখানে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে বেদনাময় স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে।
এই গাছটার নিচেই প্রথম দেখা হয়েছিল মেহরিনের সঙ্গে।
কলেজের প্রথম বর্ষের এক বর্ষণমুখর দুপুর। হঠাৎ নামা বৃষ্টিতে সবাই ছুটোছুটি করছে। মাহমুদা তখন ভিজে একাকার, হাতে কোনো ছাতা নেই। অর্ণব কিছুটা ইতস্তত করেই নিজের ছাতাটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেদিনের সেই ছোট্ট ঘটনাই ধীরে ধীরে গড়ে তোলে এক গভীর সম্পর্ক।
মাহমুদা ছিল প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল—তার হাসি যেন চারপাশকে আলোকিত করে তুলত। আর অর্ণব ছিল নীরব স্বভাবের, অনুভূতিগুলো মনে লুকিয়ে রাখা তার অভ্যাস।
দুজনের ভিন্নতা যেন তাদের আরও কাছে নিয়ে এসেছিল।
বটগাছটার নিচে বসে কত বিকেল তারা কাটিয়েছে!
মেহরিন প্রায়ই বলত,
“এই গাছটা আমাদের গল্প জানে, অর্ণব।”
অর্ণব হেসে জবাব দিত,
“তাহলে এটা আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকুক চিরদিন।”
কিন্তু সময়ের নিজেরই এক অদৃশ্য নিয়ম আছে।
কলেজ শেষ হতেই অর্ণব পাড়ি জমায় শহরে—ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। মাহমুদা থেকে যায় তার পরিবার আর দায়িত্বের বন্ধনে।
শুরুতে দূরত্ব তাদের আলাদা করতে পারেনি। প্রতিদিনের কথা, ছোট ছোট অভিমান, স্বপ্নের আদান-প্রদান—সবই চলছিল আগের মতো।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই যোগাযোগ কমতে থাকে।
কথার জায়গায় নীরবতা, আর প্রতিশ্রুতির জায়গায় অনিশ্চয়তা এসে দাঁড়ায়।
এক সন্ধ্যায় মাহমুদা বলেছিল,
“বাবা আমার বিয়ের কথা বলছে…”
নভেল কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠেছিল,
“তুমি কী চাও?”
মাহমুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল,
“আমি তোমাকে চাই। কিন্তু তুমি তো এখনো কিছুই স্থির করতে পারোনি…”
নভেল কাছে তখন ভালোবাসা ছিল, কিন্তু নিরাপত্তা ছিল না।
সে শুধু বলেছিল,
“আর একটু সময় দাও।”
কিন্তু জীবনের সব অপেক্ষার শেষ হয় না।
কিছুদিন পর মাহমুদা বিয়ে হয়ে যায়। খবরটা অর্ণব পেয়েছিল অন্যের মুখে। সেদিন তার চারপাশের সবকিছু থমকে গিয়েছিল, অথচ জীবন থেমে থাকেনি।
বছর গড়িয়ে যায়।
নভেল এখন প্রতিষ্ঠিত—ভালো চাকরি, নিজের ফ্ল্যাট, আর্থিক নিশ্চয়তা সবই আছে। তবুও তার ভেতরে এক শূন্যতা থেকে যায়, যা কোনো সাফল্য পূরণ করতে পারে না।
হঠাৎ একদিন সে ফিরে আসে সেই পুরনো শহরে।
আর অজান্তেই পা চলে আসে সেই বটগাছটার নিচে।
ঠিক তখনই—
“নভেল… তুমি?”
পরিচিত সেই কণ্ঠ শুনে তার বুক কেঁপে ওঠে।
মাহমুদা।
সময় তার মুখে ক্লান্তির ছাপ এঁকেছে, কিন্তু চোখে এখনো সেই পরিচিত গভীরতা।
কপাল ফাঁকা, হাতে নেই শাঁখা-পলা।
নভেল ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কেমন আছো?”
মাহমুদা হালকা হাসল,
“ভালো থাকার চেষ্টা করছি।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে বলল,
“সব গল্প সুখের হয় না। বিয়ের পর আমাদের সম্পর্ক টেকেনি…”
মাহমুদার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
সে শুধু বলল,
“আমি এখনো তোমার জায়গাটা ফাঁকা রেখেছি।”
মাহমুদা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল,
“এতদিন পরও?”
নভেল শান্ত গলায় বলল,
“ভালোবাসা সময়ে মাপা যায় না।”
বটগাছটার নিচে আবার তারা বসে পড়ল।
পুরনো দিনের মতোই, তবুও এক অদ্ভুত দূরত্ব নিয়ে।
মাহমুদা ধীরে বলল,
“আমরা কি আবার শুরু করতে পারি?”
নভেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আমরা চাইলে হয়তো পারতাম… কিন্তু আমরা আর আগের সেই মানুষগুলো নেই।”
মাহমুদার চোখ ভিজে উঠল।
সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। আলো ফিকে হয়ে আসছিল, ঠিক তাদের সম্পর্কের মতো।
নভেল উঠে দাঁড়াল।
“আমাকে যেতে হবে।”
“আবার দেখা হবে?”—মাহমুদার কণ্ঠে কাঁপন।
নভেল মৃদু হাসল,
“হয়তো… কোনো অন্য সময়ে, অন্য জীবনে।”
সে ধীরে ধীরে চলে গেল।
মাহমুদা দাঁড়িয়ে রইল বটগাছটার নিচে—
যেখানে একদিন ভালোবাসা জন্মেছিল, আর আজ নিঃশব্দে শেষ হলো।
কুয়াশা আবার নেমে এলো।
সময়ের মতোই—সবকিছু ঢেকে দিয়ে, শুধু স্মৃতিগুলোকে রেখে গেল অমলিন।