জায়গার সংকটে আলাদা থাকছেন পাঁচ স্ত্রী; স্ত্রীদের সঙ্গে মুসা হাসাহিয়া (মাঝে)। ছবি: এএফপি
উগান্ডার এক প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ কৃষক মুসা হাসাহিয়া কাসেরা। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ জীবনযাপন করলেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি পরিচিত ‘বিশ্বের সবচেয়ে ফারটাইল পুরুষ’ হিসেবে। তার বিশাল পরিবারের আকার যেন ছোটখাটো একটি গ্রামের সমান। দাবি করা হচ্ছে, মুসার ১২ জন স্ত্রী, ১০২ সন্তান এবং ৫৭৮ জনেরও বেশি নাতি-নাতনি রয়েছে। বিশাল এই পরিবার নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে যেখানে অনেক দম্পতির কাছে একটি বা দুটি সন্তান নেওয়া এবং তাদের বড় করাই অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে আফ্রিকার এই কৃষকের গল্প বিশ্বজুড়ে জন্ম দিয়েছে তুমুল আলোচনার। কর্মব্যস্ততা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, মানসিক চাপ কিংবা বন্ধ্যাত্বসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমান বিশ্বে পরিবার পরিকল্পনা যখন আগের চেয়ে অনেক জটিল, ঠিক তখনই বিশ্বের নজর কেড়েছেন ৬৮ বছর বয়সী মুসা।
বুগিসা গ্রামে নিজেদের বাড়ির সামনে স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে মুসা হাসাহিয়া (মাঝে)। ছবি: এএফপি
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডার বাসিন্দা মুসার বাড়িতে সবসময়ই এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যা এত বেশি যে, প্রতিদিনের রান্না, খাবার পরিবেশন ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনাই এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক সময় পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে খাওয়ার সুযোগও পায় না।
মুসা নিজেই স্বীকার করেছেন, প্রথম ও শেষ সন্তানের নাম তার মনে থাকলেও মাঝের অনেক সন্তানের নাম তিনি প্রায়ই ভুলে যান। এই সমস্যার সমাধানে তিনি একটি পুরোনো নোটবুকে সব সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নাম লিখে রেখেছেন।
পরিবার এত বড় হওয়ার পেছনে নিজের দীর্ঘদিনের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন মুসা। তিনি বহু বছর ধরে পরিবার বড় করার দিকেই মনোযোগ দিয়েছিলেন এবং তার স্ত্রীদের অনেককেই অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন। আফ্রিকার অনেক গ্রামীণ সমাজে আগে বড় পরিবারকে শক্তি ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, যা মুসাকেও প্রভাবিত করেছিল। এছাড়া কৃষিকাজে বেশি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও ছিল এই বড় পরিবারের অন্যতম কারণ।
সংসার চালাতে হিমশিম, আর পরিবার বড় না করার সিদ্ধান্ত ১০২ সন্তানের বাবা মুসার। ছবি: এএফপি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দশক আগে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সন্তান নেওয়া সাধারণ ঘটনা হলেও বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় সেই প্রবণতা অনেক কমেছে।
বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উগান্ডাসহ সাব-সাহারান আফ্রিকার কিছু দেশে এখনো জন্মহার তুলনামূলক বেশি হলেও ১০২ সন্তানের মতো ঘটনা এখন অত্যন্ত বিরল।
তবে বিশাল এই পরিবার পরিচালনা করতে গিয়ে বর্তমানে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন মুসা। কৃষিকাজ করেই পুরো পরিবারের খরচ চলে এবং পরিবারের সদস্যরাও মাঠে কাজ করেন। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত মানুষের দায়িত্ব নেওয়া তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে মুসা এখন আর নতুন কোনো সন্তান চান না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন। এমনকি স্ত্রীদেরও পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মুসার মতে, আগে বিষয়টিকে সহজ মনে হলেও এখন পরিবার সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
মুসার এই গল্প ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বিস্ময় প্রকাশ করছেন, কেউ আবার রসিকতা করছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন যে, এই মানুষ একাই একটা গ্রাম গড়ে তুলতে পারেন।
অন্য একজন মন্তব্য করেছেন, এখন একটা সন্তান বড় করতেই মানুষ হিমশিম খায়, আর উনি ১০২ সন্তান বড় করেছেন। তবে অনেকে আবার এই বিশাল পরিবারে প্রতিটি সন্তানের যথাযথ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে মুসার স্ত্রীর সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ভিন্ন তথ্যও পাওয়া যায়। কোথাও বলা হয়েছে তার ১২ জন স্ত্রী রয়েছে, আবার অনেক ভাইরাল ভিডিও ও সাক্ষাৎকারে ৮ জন স্ত্রীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ সাম্প্রতিক আলোচনা ও গণমাধ্যমে ১২ স্ত্রী ও ১০২ সন্তানের তথ্যই বেশি প্রচারিত হচ্ছে।
ছবি: এএফপি
জনসংখ্যাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক সময়ে বড় পরিবার শুধু সামাজিক নয়, বরং তীব্র অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন পরিবার ছোট রাখার প্রবণতা বেড়েছে, কারণ একটি শিশুর উপযুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বড় অঙ্কের ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
তবে আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে এখনো পরিবারকে শ্রমশক্তি হিসেবে দেখা হয়, বিশেষ করে কৃষিনির্ভর সমাজে বেশি সন্তান মানেই বেশি কর্মক্ষম মানুষ।
মুসা হাসাহিয়া কাসেরার গল্প নিঃসন্দেহে অবাক করার মতো। তবে এটি শুধু একটি বড় পরিবারের গল্প নয়, বরং আফ্রিকার গ্রামীণ সমাজ, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য ও সামাজিক বাস্তবতার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। বিশ্ব যখন ছোট পরিবার ও পরিকল্পিত জীবনের দিকে এগোচ্ছে, তখন উগান্ডার এই কৃষকের জীবন যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার গল্প মনে করিয়ে দেয়।